শেরপুর সম্পর্কে
শেরপুরের অবস্থান পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের উত্তর তীরে, নদীর ঠিক ওপারে জামালপুর; সড়কপথে ঢাকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার। দেশের ছোট জেলাগুলোর একটি, উপজেলা ৫টি: শেরপুর সদর, নকলা, নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী। দক্ষিণাংশ সমতল ধানি প্লাবনভূমি; উত্তরে মেঘালয় সীমান্ত বরাবর উঠে গেছে বনঢাকা অনুচ্চ গারো পাহাড়, যার ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে ভোগাই, চেল্লাখালী ও মহারশির মতো পাহাড়ি নদী—ভারী বৃষ্টিতে যেগুলোতে হঠাৎ ঢল নামে।
পাহাড়ি প্রান্তই শেরপুরকে আলাদা করে। ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদীর সীমান্ত গ্রামে গারো, কোচ, হাজং, বর্মণ ও হদি জনগোষ্ঠীর বাস, আর ওপার থেকে বুনো হাতির দল এখনো বনের ভেতর দিয়ে চলাচল করে, মাঝে মাঝে খেতের ফসলও খেয়ে যায়। পর্যটকের কাছে জেলাটি মানে উত্তরের পাহাড়ি পার্ক ও লেক আর দক্ষিণের শান্ত, পুরোনো বাজার-শহর—যা দেশজুড়ে বিখ্যাত দুটি খাবারের জন্য: সুগন্ধি তুলশীমালা চাল আর দুধের মিষ্টি ছানার পায়েস।
ইতিহাস
মুঘল আমলে এলাকাটির নাম ছিল দশকাহনিয়া—ব্রহ্মপুত্র পারাপারের খেয়াঘাটে দশ কাহন কড়ি মাশুল থেকে এই নাম। নবাবি আমলে স্থানীয় ভূস্বামী শের আলী গাজী প্রায় স্বাধীনভাবে অঞ্চলটি শাসন করেন, আর তাঁর নামেই শহরের নাম হয় শেরপুর। শ্রীবরদীর মাটির গড়জরিপা দুর্গ এবং কসবা ও ঘাগড়ার পুরোনো মসজিদ সেই প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের সাক্ষী। উনিশ শতকের শুরুতে শেরপুর ছিল পাগলপন্থী আন্দোলনের কেন্দ্র—করিম শাহের উত্তরসূরি টিপু শাহের নেতৃত্বে গারো, হাজং ও মুসলমান কৃষকেরা জমিদারের খাজনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।
১৯৮৪ সালে জেলা হওয়ার আগে শেরপুর ছিল জামালপুরের একটি মহকুমা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সীমান্ত এলাকায় বারবার লড়াই হয়; ছেরাখালীতে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে কমান্ডার নাজমুল আহসানসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, যাঁদের স্মৃতি স্থানীয় স্মৃতিস্তম্ভে ধরে রাখা হয়েছে।
অর্থনীতি ও জীবিকা
কৃষিই জেলার মেরুদণ্ড, আর প্রধান ফসল ধান। পোলাও, পায়েস ও উৎসবের রান্নায় ব্যবহৃত ছোট দানার সুগন্ধি তুলশীমালা চালই শেরপুরকে দেশজুড়ে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি দিয়েছে; শহর ও আশপাশের বহু চালকলে এটি প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেট করা হয়। সমভূমিতে পাট, সরিষা, আলু ও সবজি হয়, আর পাহাড়ি এলাকায় কাঁঠাল, আনারস এবং সামাজিক বনায়নের কাঠ। পাহাড়ি নদীর বালু ও পাথর, ছোট মিষ্টির দোকান এবং নকলা ও নালিতাবাড়ীর সাপ্তাহিক গরুর হাটও স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
শেরপুরে লোকগানের চর্চা জোরালো: ভাটিয়ালি, জারি ও মুর্শিদি গান আজও গাওয়া হয়। গারো সম্প্রদায় ফসল তোলার পর নিজস্ব নাচ, ঢোল ও পানীয় নিয়ে ওয়ানগালা উৎসব পালন করে, আর পাহাড়ি গ্রামগুলোতে বড়দিন বড় উৎসব।
শেরপুরের গর্ব ছানার পায়েস—তাজা ছানার ছোট বল এলাচ-সুগন্ধি ঘন দুধে ধীরে জ্বাল দিয়ে তৈরি। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী প্রায় শত বছর আগে ঘোষপট্টির মিষ্টির দোকানে এর জন্ম, আর জমিদারেরা এটি কলকাতায় নিয়ে যেতেন। তুলশীমালার পোলাও, ছানার চপ আর সুগন্ধি চালের পিঠাও এখানকার প্রিয় খাবার।
শেরপুর-এর দর্শনীয় স্থান
-
গজনী অবকাশ কেন্দ্র
ঝিনাইগাতীতে সীমান্তের কাছে শালবন আর গারো পাহাড়ের মাঝে গড়ে তোলা জনপ্রিয় পাহাড়ি বিনোদনকেন্দ্র। এখানে নৌকাসহ লেক, উঁচু ওয়াচ টাওয়ার ও ঝুলন্ত সেতু আছে; শীতে প্রচুর ভিড় হয়।
-
মধুটিলা ইকোপার্ক
নালিতাবাড়ীর বনাঞ্চলে হাঁটার পথ, লেক আর ওয়াচ টাওয়ারসহ ইকোপার্ক; টাওয়ার থেকে পাহাড় পেরিয়ে মেঘালয় পর্যন্ত দেখা যায়। সকাল ও বিকেলে দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর।
-
ঘাগড়া লস্কর বাড়ি মসজিদ
ঝিনাইগাতীর ঘাগড়ায় এক গম্বুজের ছোট ইটের মসজিদ, চারপাশে বারোটি ছোট মিনার। নির্মাণকাল নিয়ে মতভেদ আছে, তবে এটি জেলার টিকে থাকা প্রাচীনতম স্থাপনাগুলোর একটি।
-
রাজার পাহাড়
শ্রীবরদীতে ঢেউফা নদীর পাশে চ্যাপ্টা চূড়ার একটি পাহাড়, প্রচলিত আছে স্থানীয় এক রাজার নামে এর নাম। বন ও নদীর দৃশ্য আর কাছের গারো গ্রাম মিলিয়ে আধবেলার চমৎকার ভ্রমণ।
-
গড়জরিপা দুর্গ
শ্রীবরদীতে কয়েক শতাব্দী পুরোনো দুর্গের মাটির প্রাচীর ও পরিখার ধ্বংসাবশেষ। অঞ্চলের প্রাক-ঔপনিবেশিক ইতিহাসে আগ্রহীদের জন্য নিরিবিলি একটি জায়গা।
শেরপুর যে জন্য বিখ্যাত
শেরপুর কীভাবে যাবেন
শেরপুরে নিজস্ব রেলপথ নেই। ঢাকার মহাখালী টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ হয়ে সরাসরি বাস চলে, সময় লাগে মোটামুটি সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। অথবা কমলাপুর থেকে আন্তঃনগর ট্রেনে প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায় জামালপুর গিয়ে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র সেতু পেরিয়ে বাস বা সিএনজিতে শেরপুর শহরে যাওয়া যায়। শেরপুর শহর থেকে লোকাল বাস ও সিএনজিতে প্রায় এক ঘণ্টায় গজনীর জন্য ঝিনাইগাতী এবং মধুটিলার জন্য নালিতাবাড়ী পৌঁছানো যায়।
হাট ও বাজার
- ঘোষপট্টি, শেরপুর শহর
- পুরোনো মিষ্টির গলি, যেখানে ছানার পায়েসের জন্ম বলে কথিত। এখানকার ও শহরের কেন্দ্রের দোকানগুলোতে তাজা ছানার পায়েসের পাশাপাশি দই, ছানার চপ ও অন্যান্য দুধের মিষ্টি পাওয়া যায়।
- নকলা হাট
- নকলা উপজেলার বড় সাপ্তাহিক হাট, দেশি গরু-ছাগলের পাশাপাশি আশপাশের খামারের ধান, আলু ও সবজির জন্য পরিচিত।
- নালিতাবাড়ী হাট
- পাহাড়ি সীমান্তের কাছে নালিতাবাড়ীর সাপ্তাহিক হাট, যেখানে গরু, কৃষিপণ্য, বনের ফল এবং গারোসহ পাহাড়ি গ্রামের নানা জিনিস বেচাকেনা হয়।
এক নজরে শেরপুর
মিডমার্টে শেরপুর-এর দোকান
শেরপুর থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
শেরপুর-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনশেরপুর নিয়ে প্রশ্ন
শেরপুর-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
শেরপুর থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনময়মনসিংহ বিভাগের আরও জেলা
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Sherpur District
- Wikipedia — Sherpur District (BBS Census 2022 figures)
- City Population — Bangladesh districts, Census 2022 (unadjusted preliminary count)
- Sherpur district portal — Ghagra Khan Bari mosque
- Ittefaq — Sherpur chhanar payesh recognised
- মধুটিলা ইকোপার্ক, নালিতাবাড়ী — ছবি: Redmin · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- ঝিনাইগাতী, শেরপুর — ছবি: Nahid Sultan · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা