বগুড়া সম্পর্কে
রাজশাহী বিভাগের উত্তর দিকে, ঢাকা আর রংপুরের প্রায় মাঝামাঝি বগুড়া জেলা। উত্তরবঙ্গের দিকে যাওয়া বেশির ভাগ যাত্রী এই শহর পার হন, তাই একে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বলা হয়। শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে করতোয়া। আজ নদীটি সরু, কিন্তু প্রাচীনকালে এটি ছিল বড় নদী। পূর্ব সীমান্তে চওড়া যমুনা জামালপুর আর গাইবান্ধা থেকে জেলাটিকে আলাদা করেছে। মাঝের কৃষিজমির পানি সরে বাঙালী, নাগর ও ইছামতী দিয়ে।
জেলার মাটি দুই রকম। পূর্বে যমুনার পাশে নিচু পলিমাটি, সেখানে চরে শুকনো মৌসুমে মরিচ, ভুট্টা আর সবজি হয়। পশ্চিমে বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু লালচে পুরোনো মাটি, সেখানে গাছপালা বেশি আর বন্যা কম। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা প্রায় ৩৭ লাখ, যা রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ২০২৬ সালের মে মাসে মোকামতলা জেলার ১৩তম উপজেলা হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে।
বাংলাদেশের যে কাউকে জিজ্ঞেস করুন বগুড়া কিসের জন্য বিখ্যাত, উত্তর আসবে মাটির সরায় জমানো মিষ্টি দই। ইতিহাসপ্রেমীরা বলবেন মহাস্থানগড়ের কথা। প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের এই প্রাচীরঘেরা ধ্বংসাবশেষ বাংলার সবচেয়ে পুরোনো নগর-বসতিগুলোর একটি।
ইতিহাস
সাধারণভাবে বলা হয়, জেলার নাম এসেছে দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের ছেলে নাসিরুদ্দিন বুগরা খানের নাম থেকে। তিনি তেরো শতকের শেষ দিকে বাংলার শাসক ছিলেন। তবে এই অঞ্চলের ইতিহাস তার চেয়ে অনেক পুরোনো। মহাস্থানে পাওয়া ব্রাহ্মী লিপিতে মৌর্য আমলের প্রাদেশিক কেন্দ্র হিসেবে পুণ্ড্রনগরের নাম আছে। এরপর শত শত বছর গুপ্ত, পাল ও পরবর্তী শাসকদের সময়ে করতোয়ার তীরের এই নগরী ছিল পুণ্ড্রবর্ধনের কেন্দ্র। এটি তীর্থস্থানও ছিল, স্থানীয় ঐতিহ্যে শাহ সুলতান বলখী মাহীসওয়ারের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮২১ সালে আশপাশের জেলার অংশ নিয়ে বগুড়া জেলা গঠিত হয়। বিশ শতকে এখান থেকে উঠে এসেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তরুণ বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী। ১৯৭১ সালে শহর ও আশপাশে মুক্তিযোদ্ধারা একাধিক যুদ্ধ করেন। ২০১৮ সালে জেলার সরকারি ইংরেজি বানান Bogra থেকে বদলে Bogura করা হয়।
অর্থনীতি ও জীবিকা
এখনো কৃষিই প্রধান জীবিকা, তাতে এগিয়ে ধান, আলু আর সবজি। মরিচ উৎপাদনে বগুড়া দেশে প্রথম। এর বড় অংশ হয় সারিয়াকান্দি ও সোনাতলার যমুনার চরে, আর নদীর পাড়েই রোদে শুকানো হয়। শহরটি দেশের হালকা প্রকৌশল শিল্পেরও কেন্দ্র। প্রায় দেড় হাজার ঢালাই কারখানা ও ওয়ার্কশপে পাম্পের যন্ত্রাংশ, ধান মাড়াইয়ের যন্ত্র, ইঞ্জিনের লাইনারসহ কৃষিযন্ত্রের নানা খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি হয়, দেশের চাহিদার বড় অংশ যায় এখান থেকে। হিমাগার আর পাইকারি হাট থেকে প্রতি রাতে ট্রাকে আলু ও শীতের সবজি ঢাকা-চট্টগ্রামে যায়।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
বগুড়ার সবচেয়ে পরিচিত পণ্য দই। ঘন, ক্যারামেলের মতো মিষ্টি এই দই অগভীর মাটির সরায় জমানো হয়, আর এর কৃতিত্ব সাধারণত দেওয়া হয় শেরপুরের ঘোষদের। মহাস্থানে গেলে মাজারের পাশে বিক্রি হওয়া মুচমুচে ভাজা মিষ্টি কটকটি কেনেন প্রায় সবাই। এখানকার কথ্য ভাষা উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রি ধাঁচের। পহেলা বৈশাখ আর শীতের গ্রামীণ মেলা এখনো বড় আয়োজন।
শহরের কেন্দ্র সাতমাথা, সাতটি রাস্তার এই মোড়ে সবাই দেখা করতে আসেন। কাছেই নবাববাড়ি, বগুড়ার নবাবদের পুরোনো প্রাসাদ, যা এখন জাদুঘর ও পার্ক। সরকারি আজিজুল হক কলেজ শিক্ষার্থীতে ভরা থাকে, আর বার্ষিক শিল্প ও বাণিজ্য মেলায় পুরো উত্তরবঙ্গ থেকে মানুষ আসে।
বগুড়া-এর দর্শনীয় স্থান
-
মহাস্থানগড়
শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে, করতোয়ার পশ্চিম তীরে প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের প্রাচীরঘেরা ধ্বংসাবশেষ। ইটের প্রাচীরের ওপর দিয়ে হাঁটা যায়, খনন করা প্রবেশদ্বার দেখা যায়। পাশের জাদুঘরে আছে এখানে পাওয়া পোড়ামাটির ফলক, মুদ্রা ও ভাস্কর্য।
-
গোকুল মেধ (বেহুলার বাসরঘর)
মহাস্থানের দক্ষিণে ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া বিশাল ইটের ঢিবি। লোকবিশ্বাসে মনসামঙ্গলের বেহুলা-লখিন্দরের সঙ্গে জড়ানো, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা একে মোটামুটি গুপ্ত যুগের বলে মনে করেন। মহাস্থান থেকে ফেরার পথে সহজেই দেখে আসা যায়।
-
খেরুয়া মসজিদ
শেরপুর উপজেলায় আকবরের শাসনামলে ১৫৮২ সালে নির্মিত তিন গম্বুজের ইটের মসজিদ। বাঁকা কার্নিশ আর কোণের মিনারের কারণে এটি উত্তরবঙ্গে সবচেয়ে ভালোভাবে টিকে থাকা মোগল আমলের মসজিদগুলোর একটি।
-
নবাববাড়ি (মোহাম্মদ আলী প্যালেস)
শহরের কেন্দ্রে বগুড়ার নবাব পরিবারের পুরোনো বাসভবন, এখন জাদুঘর ও পার্ক। যে পরিবার থেকে পাকিস্তানের একজন প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন, তাদের গল্প জানতে এখানে নিরিবিলি এক ঘণ্টা কাটানো যায়।
-
শাহ সুলতান বলখী (রহ.)-এর মাজার, মহাস্থান
মহাস্থানের ঢিবির ওপর এই মাজারে সারা বছর ভক্তরা আসেন। এর ফটকের পাশের দোকান থেকেই বেশির ভাগ দর্শনার্থী কটকটি কেনেন।
বগুড়া যে জন্য বিখ্যাত
বগুড়া কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বগুড়ার দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। সড়কপথে সিরাজগঞ্জ হয়ে বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতু পার হয়ে মোটামুটি ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা লাগে, সেতুর আশপাশের যানজটের ওপর সময় নির্ভর করে। ঢাকার গাবতলী ও মহাখালী থেকে বাস ছেড়ে বগুড়ার চারমাথা ও ঠনঠনিয়ায় পৌঁছায়। কমলাপুর থেকে রংপুর ও লালমনিরহাটগামী আন্তঃনগর ট্রেন বগুড়া স্টেশনে থামে। শহরে নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট নেই, তাই আকাশপথে গেলে রাজশাহী বা সৈয়দপুরে নেমে সড়কপথে আসতে হয়।
হাট ও বাজার
- মহাস্থান হাট
- প্রত্নস্থলের পাশেই দেশের অন্যতম বড় পাইকারি সবজির হাট। এখান থেকে প্রতিদিন কয়েক ডজন ট্রাকে ফুলকপি, মুলা, মরিচ আর আলু ঢাকা ও চট্টগ্রামে যায়।
- বিসিক শিল্পনগরী ও রেলওয়ে মার্কেট
- রেলওয়ে মার্কেট আর বিসিক এলাকার গলিগুলো ঢালাই কারখানা আর মেশিনের দোকানে ভরা। কৃষিযন্ত্রের পাম্পের যন্ত্রাংশ, মাড়াই যন্ত্র আর ইঞ্জিনের খুচরা যন্ত্রাংশ এখানেই তৈরি ও বিক্রি হয়।
- সাতমাথা ও ফতেহ আলী বাজার
- শহরকেন্দ্রের ব্যস্ত কেনাকাটার এলাকা। দই-মিষ্টির দোকান, কাপড়ের দোকান আর ফতেহ আলী বাজারে প্রতিদিনের কাঁচাবাজার সবই এখানে।
এক নজরে বগুড়া
মিডমার্টে বগুড়া-এর দোকান
বগুড়া-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনবগুড়া নিয়ে প্রশ্ন
বগুড়া-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
বগুড়া থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনরাজশাহী বিভাগের আরও জেলা
- জয়পুরহাট লতিরাজ, আলু আর দেশের বড় চিনিকলের জেলা
- নওগাঁ বরেন্দ্রের শস্যভান্ডার, পাহাড়পুর আর আম্রপালির দেশ
- নাটোর রানী ভবানীর রাজবাড়ি, চলনবিল আর কাঁচাগোল্লার নাটোর
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের রাজধানী, গৌড়ের সুলতানি মসজিদ আর গম্ভীরার দেশ
- পাবনা পদ্মা-যমুনার মাঝে পেঁয়াজ, লিচু আর ঘিয়ের পাবনা
- রাজশাহী পদ্মাপাড়ের রেশম নগরী: আম, মন্দির আর শিক্ষার শহর
- সিরাজগঞ্জ তাঁত, দুধ আর যমুনার ওপরের সেতুর জেলা
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Bogra District
- Wikipedia — Bogura District (BBS Census 2022 final enumerated population and literacy)
- Bangladesh Bureau of Statistics — Population and Housing Census 2022
- The Daily Star — Bogura's foundries flourish against odds
- TBS News — Bogura chilli production set to exceed target
- মহাস্থানগড়, প্রাচীন পুণ্ড্রনগর — ছবি: Zaheed Sarwer Khan · CC BY 4.0 (উৎস, CC BY 4.0)
- খেরুয়া মসজিদ, শেরপুর (১৫৮২) — ছবি: Rangan Datta Wiki · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা