ঝালকাঠি সম্পর্কে
ঝালকাঠি দেশের ছোট জেলাগুলোর একটি, বরিশালের ঠিক পশ্চিমে প্রায় ৭০৭ বর্গকিলোমিটার জুড়ে। ঝালকাঠি সদর, নলছিটি, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া — এই ৪টি উপজেলায় প্রায় ৬ লাখ ৬১ হাজার মানুষের বাস। ২০২২ সালের জনশুমারিতে সাক্ষরতার হার ৮৩ শতাংশের বেশি, যা দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ। জেলার স্লোগানেই পরিচয় — "সুস্বাদু পেয়ারা আর শীতলপাটির দেশ"।
পুরো জেলাজুড়েই পানি। সুগন্ধা, বিষখালী, ধানসিঁড়ি আর গাবখান নদী এবং অসংখ্য খাল জমিকে ভাগ করেছে; গাবখান চ্যানেল ঢাকা-খুলনা নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। ঝালকাঠি শহর গড়ে উঠেছিল নদীবন্দর হিসেবে; উনিশ ও বিশ শতকের শুরুতে চাল, লবণ, কাঠ আর সুপারির পাইকারি ব্যবসা এত জমজমাট ছিল যে লোকে একে "দ্বিতীয় কলকাতা" বলত।
নদী থেকে ভেতরের দিকে ঝালকাঠি সদরের পশ্চিমাংশ মিশে গেছে পেয়ারার অঞ্চলে, যা বরিশালের বানারীপাড়া আর পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে সরু খালের দুই পাড়ে বাগান, আর ফসল বাজারে যায় সড়কে নয়, নৌকায়।
ইতিহাস
এ অঞ্চল ছিল চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অংশ, পরে ব্রিটিশ আমলে বাকেরগঞ্জ জেলার অধীনে। ১৬৫০-এর দশকে মোগল সুবাদার শাহ সুজা মোহনায় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের ঠেকাতে বর্তমান নলছিটির সুজাবাদে একটি কেল্লা নির্মাণ করেন; তার ধ্বংসাবশেষ আজও আছে। ঔপনিবেশিক আমলে নদীবাণিজ্যে ঝালকাঠি বন্দর ফুলেফেঁপে ওঠে, আর কীর্তিপাশার জমিদাররা রেখে যান বিশাল জমিদারবাড়ি, যার ভগ্নাবশেষ এখনও দেখা যায়। ১৯৭২ সালে ঝালকাঠি মহকুমা এবং ১৯৮৪ সালে জেলা হয়।
দুই বিশিষ্ট মানুষের জন্ম এখানে — শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক জন্মেছেন রাজাপুরের সাতুরিয়ায় তাঁর মাতুলালয়ে, আর ব্রিটিশ ভারতের প্রথম নারী স্নাতকদের একজন, কবি ও নারী-অধিকারকর্মী কামিনী রায় জন্মেছেন বাসণ্ডায়। ১৯৭১ সালে ঝালকাঠি ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়; একাধিক বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
অর্থনীতি ও জীবিকা
কৃষি আর ব্যবসাই প্রধান। পেয়ারা জেলার পরিচয়বাহী ফসল — খালপাড়ের হাজার হাজার একর বাগানে পেয়ারার পাশাপাশি আমড়া, লেবু, সুপারি ও নারকেল হয়, বাকি জমিতে ধান। রাজাপুরের হাইলাকাঠির মতো গ্রামে মুর্তা বেত দিয়ে শীতলপাটি বুনে বহু পরিবার জীবিকা চালায়, আর ঝালকাঠি শহরে নদীপথে পাইকারি ব্যবসা এখনও চলে। নৌকা তৈরি, ছোট কলকারখানা আর প্রবাসী আয়ও সংসারে যোগান দেয়।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
ভাসমান পেয়ারার হাট ঝালকাঠির সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য, তবে কারুশিল্পও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মুর্তা বেত চিরে বোনা সূক্ষ্ম, ঠান্ডা শীতলপাটি তৈরি করেন পাটিকর পরিবারগুলো, বংশপরম্পরায় শেখা দক্ষতায়; কখনো রঙিন বেতে নকশাও তোলা হয়।
খাবার নদীর মতোই — মাছের তরকারি, মৌসুমে পেয়ারা আর আমড়া, গুড় দিয়ে চিড়া-মুড়ি। কথ্য ভাষা বরিশালি, আর জেলাটি গর্ব করে তার কবিদের নিয়ে — কামিনী রায় থেকে জীবনানন্দ দাশ, যাঁর প্রিয় ধানসিঁড়ি নদী ঝালকাঠির পাশ দিয়েই বয়ে গেছে।
ঝালকাঠি-এর দর্শনীয় স্থান
-
ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারার হাট
ঝালকাঠি শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ভীমরুলীতে তিন খালের মোহনায় পেয়ারাবোঝাই শত শত ছোট নৌকা জড়ো হয়। মোটামুটি জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে; সকালে গিয়ে নৌকা ভাড়া করে হাট আর আশপাশের বাগান ঘুরে দেখা যায়।
-
সুজাবাদ কেল্লা
নলছিটি উপজেলায় সতেরো শতকের মাঝামাঝি শাহ সুজার সঙ্গে যুক্ত মোগল কেল্লার ধ্বংসাবশেষ। মাটির ওপর সামান্যই টিকে আছে, তবু ব-দ্বীপের জলদস্যু-যুদ্ধের স্মৃতি বহন করে।
-
কীর্তিপাশা জমিদারবাড়ি
পেয়ারার খালের কাছেই কীর্তিপাশার পুরোনো জমিদারদের জীর্ণ প্রাসাদ ও মন্দির; ভীমরুলী ভ্রমণের সঙ্গে একসঙ্গে দেখে আসা যায়।
-
গাবখান সেতু ও চ্যানেল
ঝালকাঠি শহরের কাছে গাবখান চ্যানেলের ওপর দীর্ঘ সড়কসেতু; এখান থেকে দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথে মালবাহী জাহাজ আর লঞ্চের চলাচল দেখা যায়।
ঝালকাঠি যে জন্য বিখ্যাত
ঝালকাঠি কীভাবে যাবেন
ঝালকাঠি বরিশাল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পশ্চিমে। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বাসে মোটামুটি ৫ ঘণ্টায় ঝালকাঠি পৌঁছানো যায়; অথবা বাস বা রাতের লঞ্চে বরিশাল গিয়ে সেখান থেকে এক ঘণ্টারও কম সময়ে সড়কপথে। সদরঘাটের কিছু লঞ্চ সরাসরি ঝালকাঠিতেও থামে। নিকটতম বিমানবন্দর বরিশাল। ভীমরুলী যেতে ঝালকাঠি শহর থেকে অটোরিকশা বা স্থানীয় নৌকা নিন।
হাট ও বাজার
- ভীমরুলী পেয়ারার হাট
- শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি সত্যিকারের পাইকারি বাজার — চাষিরা নৌকাভর্তি পেয়ারা বিক্রি করেন ব্যাপারীদের কাছে, যাঁরা তা পাঠান ঢাকা ও অন্যান্য শহরে।
- ঝালকাঠি বড় বাজার
- শহরের পুরোনো নদীতীরের পাইকারি বাজার; চাল, মসলা, গৃহস্থালি পণ্য আর আশপাশের গ্রামের ফসলের কেনাবেচা হয়।
- রাজাপুরের শীতলপাটি কারিগর
- রাজাপুরের হাইলাকাঠির মতো বুননগ্রাম, যেখানে পাটিকর পরিবার ও তাঁদের সমবায়ের কাছ থেকে সরাসরি পাটি অর্ডার করা যায়।
এক নজরে ঝালকাঠি
মিডমার্টে ঝালকাঠি-এর দোকান
ঝালকাঠি থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
ঝালকাঠি-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনঝালকাঠি নিয়ে প্রশ্ন
ঝালকাঠি-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
ঝালকাঠি থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনবরিশাল বিভাগের আরও জেলা
- বরিশাল ধান, নদী, খাল আর লঞ্চের শহর: দক্ষিণবঙ্গের পুরোনো প্রাণকেন্দ্র
- বরগুনা বিষখালী আর বলেশ্বর যেখানে সাগরে মেশে: ইলিশ, ম্যানগ্রোভ আর রাখাইন তাঁত
- ভোলা দেশের সবচেয়ে বড় দ্বীপ — ইলিশ আর মহিষের দইয়ের ভোলা
- পটুয়াখালী সাগরকন্যা পটুয়াখালী: কুয়াকাটার সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, তরমুজ আর পায়রা বন্দর
- পিরোজপুর ভাসমান পেয়ারার হাট, কাঠ, নার্সারি আর পানিতে ভাসা বাগান
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Jhalokati District
- BBS Population and Housing Census 2022 — district figures (City Population summary)
- Wikipedia — Jhalokathi District (literacy from Census 2022 District Report)
- The Daily Star — Floating guava market now a tourist spot
- The Daily Star — Meet the Patikars (Rajapur shitalpati)
- ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারার হাট — ছবি: Lonely Explorer · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা