ভোলা সম্পর্কে
ভোলা একটি দ্বীপজেলা। এর মূল দ্বীপটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া যেখানে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে ঠিক সেখানে; চারপাশে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট চর আর আলাদা দ্বীপ-উপজেলা মনপুরা। ভোলা সদর, বোরহানউদ্দিন, দৌলতখান, তজুমদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন ও মনপুরা — এই ৭টি উপজেলা নিয়ে প্রায় ৩,৪০৩ বর্গকিলোমিটারের জেলা; ২০২২ সালের জনশুমারিতে লোকসংখ্যা প্রায় ১৯ লাখ ৩২ হাজার।
পলিমাটিতে গড়া এই ভূমি এখনও নবীন, এখনও বদলাচ্ছে — দক্ষিণে নতুন চর জাগে, আর পূর্বে মেঘনার ভাঙনে গ্রাম হারিয়ে যায়। ভোলা শহর দ্বীপের পশ্চিম দিকে তেঁতুলিয়ার কাছে; মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ শুধু নদীপথে — বরিশালের দিকে লাহারহাট ও ভেদুরিয়া, আর পূর্বে লক্ষ্মীপুরের ফেরি।
ভোলা মানেই ইলিশ। এখানকার মেঘনা আর তেঁতুলিয়া পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ইলিশের জলাধার, উপকূল জুড়ে অসংখ্য মাছঘাট। দ্বীপের নিচেই রয়েছে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র, যেখান থেকে স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস যায়।
ইতিহাস
ধারণা করা হয়, তেরো শতকে দ্বীপটি জাগতে শুরু করে এবং ১৩০০ সালের দিকে চাষাবাদ শুরু হয়। বহু শতাব্দী এর নাম ছিল দক্ষিণ শাহবাজপুর; ঔপনিবেশিক আমলে কখনো বাকেরগঞ্জ, কখনো নোয়াখালীর অধীনে থেকে ১৮৬৯ সালে স্থায়ীভাবে বরিশালের অন্তর্ভুক্ত হয়, আর ১৮৭৬ সালে প্রশাসনিক সদর দৌলতখান থেকে ভোলায় আসে। জনশ্রুতি আছে, শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালে খেয়া পারাপার করতেন বৃদ্ধ মাঝি ভোলা গাজী, তাঁর নামেই ভোলা। ১৯৮৪ সালে ভোলা পৃথক জেলা হয়।
বিশ্ব ভোলাকে মনে রেখেছে ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ের জন্য — ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস ভোলা ও আশপাশের উপকূল ভাসিয়ে নিয়েছিল; সরকারের ধীর সাড়া একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পথে রাজনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করে। মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের জন্মও এই জেলায়।
অর্থনীতি ও জীবিকা
অর্থনীতি চলে মাছ আর কৃষিতে। হাজারো জেলে পরিবার ইলিশের ওপর নির্ভরশীল; প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেই তুলাতুলী, ইলিশা ঘাটের মতো অবতরণকেন্দ্র ক্রেতায় ভরে যায়। উর্বর চরে আমন ও বোরো ধান, সুপারি, নারকেল, মরিচ, সয়াবিন আর সবজি হয়; বাইরের চরগুলোতে বড় বড় মহিষের পাল চরে, যাদের দুধে তৈরি হয় ভোলার দই। শাহবাজপুরের গ্যাসে চলছে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, আর বহু পরিবার প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
ভোলার সবচেয়ে পরিচিত স্বাদ মহিষের দই — কাঁচা মহিষের দুধ মাটির হাঁড়িতে কোনো সাজ ছাড়াই নিজে নিজে জমে যায়। এত ঘন যে ছুরি দিয়ে কাটা যায়, হালকা টক; মুড়ি, চিড়া আর গুড় দিয়ে খাওয়া হয়। এটি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে। নানা পদের ইলিশ, নারকেলের তরকারি আর শীতের পিঠায় পূর্ণ হয় দ্বীপের খাবারের থালা।
জীবন চলে নদী আর মাছ ধরার পঞ্জিকা মেনে — ইলিশের মৌসুমে মেঘনায় নির্ঘুম রাত, আর নিষেধাজ্ঞার সময় শান্ত অপেক্ষা। ২০০৯ সালের চলচ্চিত্র "মনপুরা" মেঘনার এক চরের গল্প বলে ভোলার প্রকৃতিকে সারা দেশের দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
ভোলা-এর দর্শনীয় স্থান
-
চর কুকরী মুকরী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য
চরফ্যাশনের দক্ষিণে বনায়নে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ দ্বীপ, কেওড়া বনের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে গেছে খাল। হরিণ, বানর আর শীতের পাখি মূল আকর্ষণ; কাছেই ঢালচরের তারুয়া সৈকত খোলা সাগরের মুখোমুখি।
-
জ্যাকব টাওয়ার, চরফ্যাশন
চরফ্যাশন শহরে প্রায় ২২৫ ফুট (৬৯ মিটার) উঁচু সরু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, ২০১৮ সালে খুলে দেওয়া হয়। লিফট ও সিঁড়িতে উঠে দেখা যায় ধানখেত, নদী আর উপকূলের বিস্তৃত দৃশ্য।
-
মনপুরা দ্বীপ
মেঘনার বুকে দ্বীপ-উপজেলা, লঞ্চ বা ট্রলারে যেতে হয়। নিরিবিলি চরের সৈকত, গোচারণভূমি, ম্যানগ্রোভ বনায়ন আর টাটকা ইলিশের জন্য পরিচিত।
-
বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্মৃতি জাদুঘর
ভোলায় জন্ম নেওয়া একাত্তরের এই বীরের স্মরণে নির্মিত জাদুঘর ও গ্রন্থাগার, যেখানে তাঁর জীবন ও মুক্তিযুদ্ধের নানা নিদর্শন রাখা আছে।
ভোলা যে জন্য বিখ্যাত
ভোলা কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি যাওয়ার পথ সদরঘাট থেকে লঞ্চে ইলিশা ঘাট বা ভোলা, জাহাজভেদে প্রায় ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা; দিনের ও রাতের দুই ধরনের সার্ভিসই আছে। সড়কপথে পদ্মা সেতু হয়ে বাসে বরিশাল, তারপর লাহারহাট বা ভেদুরিয়া থেকে ফেরি বা স্পিডবোটে পার হতে হয়; সব মিলিয়ে মোটামুটি ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী থেকে সাধারণত লক্ষ্মীপুর-ইলিশা ফেরিতে আসা হয়। নিকটতম বিমানবন্দর বরিশাল।
হাট ও বাজার
- ভোলা শহরের দইয়ের দোকান
- ভোলা শহরের কয়েক ডজন ছোট দোকানে প্রতিদিন মাটির হাঁড়িতে মহিষের দই বিক্রি হয়; সকালে টাটকা কেনাই ভালো।
- তুলাতুলী ও ইলিশা মাছঘাট
- ভোলা শহরের কাছে মেঘনার পাড়ে ব্যস্ত অবতরণকেন্দ্র, নৌকা থেকে নামিয়েই ইলিশ নিলামে ওঠে; অক্টোবরের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে জমজমাট।
- চরফ্যাশন বাজার
- দ্বীপের দক্ষিণাংশের প্রধান বাজার, চরের মাছ, ধান, সুপারি ও সবজির কেনাবেচা হয়; কুকরী মুকরী যাওয়ার ঘাঁটিও এখানেই।
এক নজরে ভোলা
মিডমার্টে ভোলা-এর দোকান
ভোলা থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
ভোলা-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনভোলা নিয়ে প্রশ্ন
ভোলা-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
ভোলা থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনবরিশাল বিভাগের আরও জেলা
- বরিশাল ধান, নদী, খাল আর লঞ্চের শহর: দক্ষিণবঙ্গের পুরোনো প্রাণকেন্দ্র
- বরগুনা বিষখালী আর বলেশ্বর যেখানে সাগরে মেশে: ইলিশ, ম্যানগ্রোভ আর রাখাইন তাঁত
- ঝালকাঠি সুস্বাদু পেয়ারা আর শীতলপাটির দেশ, খালে খালে ভাসমান হাট
- পটুয়াখালী সাগরকন্যা পটুয়াখালী: কুয়াকাটার সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, তরমুজ আর পায়রা বন্দর
- পিরোজপুর ভাসমান পেয়ারার হাট, কাঠ, নার্সারি আর পানিতে ভাসা বাগান
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Bhola District
- BBS Population and Housing Census 2022 — district figures (City Population summary)
- Wikipedia — Bhola District (literacy from Census 2022 District Report)
- বাংলা উইকিপিডিয়া — ভোলা জেলা (ইউনিয়ন সংখ্যা)
- Wikipedia — Jakob Tower
- The Daily Star — Buffalo curd: a delectable Bhola delicacy
- চর কুকরী মুকরীতে মাছধরা নৌকা — ছবি: HAHoque · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- চর কুকরী মুকরীর বনের খাল — ছবি: Munmun.13 · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা