পাবনা সম্পর্কে
পূর্ব দিকে বয়ে চলা পদ্মা যেখানে যমুনার সঙ্গে মিলনের দিকে এগোয়, সেই কোণে পাবনার অবস্থান। দক্ষিণে পদ্মার ওপারে কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ী, আর পূর্ব সীমানার একাংশ যমুনা। ভেতরে বড়াল, ইছামতী, আত্রাই, হুরাসাগর ও চিকনাই নদী আর চলনবিলের দক্ষিণ প্রান্ত মিলে এলাকাটি নিচু, উর্বর আর প্রায়ই জলাবদ্ধ। এখান থেকেই আসে দেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল।
জেলার দুটি একেবারে আলাদা চেহারা। পশ্চিমের ঈশ্বরদী রেল ও শিল্পের শহর। সেখানে আছে বড় রেল জংশন, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, ইক্ষু ও কৃষি গবেষণার জাতীয় কেন্দ্র, আর রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পূর্বে সুজানগর, সাঁথিয়া আর বেড়া কৃষি আর দুধের এলাকা, পেঁয়াজ আর দুধের জন্য বিখ্যাত। মাঝখানে পাবনা শহর, লাইব্রেরি, কলেজ আর দীর্ঘ সাহিত্যিক ঐতিহ্যের এক পুরোনো সংস্কৃতিমনা জেলা সদর।
ইতিহাস
নামটি কোথা থেকে এসেছে তা নিশ্চিত নয়; স্থানীয় ইতিহাসবিদেরা কয়েকটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। ১৮৩২ সাল থেকে পাবনা আলাদা জেলা, উত্তরবঙ্গের পুরোনো জেলা সদরগুলোর একটি। ১৮৭৩ সালে তখনকার পাবনা জেলার ইউসুফশাহী পরগনায় পাবনা কৃষক বিদ্রোহ হয়। জমিদারদের বেআইনি খাজনা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রজারা সমিতি গড়ে প্রতিরোধ করেন, যা ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনের পথ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। পাকশীতে পদ্মার ওপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ চালু হয় ১৯১৫ সালে, আর কয়েক দশক ধরে এটিই ছিল উত্তরবঙ্গ আর কলকাতার মধ্যে প্রধান রেল সংযোগ।
পাবনা থেকে অস্বাভাবিক সংখ্যক বিখ্যাত মানুষ উঠে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন চলচ্চিত্র তারকা সুচিত্রা সেন, লেখক প্রমথ চৌধুরী, কবি বন্দে আলী মিয়া আর বৈমানিক সাইফুল আজম। আধ্যাত্মিক নেতা শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্ম হিমায়েতপুরে। দেশের অন্যতম বড় ওষুধ প্রস্তুতকারক স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের যাত্রা শুরু ১৯৫৮ সালে পাবনায়।
অর্থনীতি ও জীবিকা
দেশের মোট পেঁয়াজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয় পাবনায়, বেশির ভাগ সুজানগর, সাঁথিয়া আর বেড়ায়। ভালো দামের আশায় কৃষকেরা মাসের পর মাস ঘরে পেঁয়াজ মজুত রাখেন। ঈশ্বরদীকে বলা হয় লিচুর রাজধানী, হাজার হাজার হেক্টর বাগান থেকে মে-জুনে প্রতিদিন ট্রাকভর্তি লিচু যায়। পূর্বের চরাঞ্চলে বড় বড় গরুর খামার, আর সর থেকে ধীরে জ্বাল দিয়ে বানানো পাবনার ঘি সারা দেশে চাহিদাসম্পন্ন। জেলা শহরের আশপাশের গ্রামে লুঙ্গি, শাড়ি আর গামছার তাঁত এখনো চলে। ওষুধ শিল্প, ঈশ্বরদী ইপিজেড আর রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্প শিল্পে কর্মসংস্থান দেয়।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
পাবনায় পড়াশোনা আর নাটকের সংস্কৃতি শক্তিশালী। অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরির যাত্রা ১৮৯০ সালে, আর শহরের কলেজ ও নাট্যদলগুলো পুরোনো ও সক্রিয়। জারি, সারি আর ধুয়া গানের মতো লোকসংগীত, নৌকাবাইচ আর কুস্তি নদীতীরের গ্রামগুলোর ঐতিহ্য। ভোজনরসিকেরা আসেন ঘি, পাবনা শহরের মিষ্টির দোকান আর গ্রীষ্মের শুরুতে টাটকা লিচুর টানে।
পাবনা-এর দর্শনীয় স্থান
-
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু, পাকশী
১৯১৫ সালের ইস্পাতের রেলসেতু আর তার পাশের আধুনিক সড়কসেতু ঈশ্বরদী আর কুষ্টিয়ার মাঝে পদ্মা পার হয়েছে। সূর্যাস্তে সেতু দিয়ে ট্রেন পার হওয়া দেখতে পাকশীর নদীপাড় জনপ্রিয় জায়গা।
-
জোড় বাংলা মন্দির
পাবনা শহরে আঠারো শতকের ইটের মন্দির, জোড়া চালাঘরের (জোড় বাংলা) ধাঁচে তৈরি। সম্মুখভাগে পোড়ামাটির সূক্ষ্ম কারুকাজ।
-
চাটমোহর শাহী মসজিদ
বিদ্রোহী মোগল সেনাপতি মাসুম খান কাবুলির সময়ে ১৫৮১ সালে নির্মিত তিন গম্বুজের ইটের মসজিদ। অঞ্চলের সবচেয়ে পুরোনো তারিখযুক্ত মসজিদগুলোর একটি।
-
সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়ি
পাবনা শহরের যে বাড়িতে বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি বড় হয়েছেন, সেটি এখন তাঁর জীবন আর চলচ্চিত্র নিয়ে স্মৃতি জাদুঘর।
-
রূপপুর ও ঈশ্বরদীর পদ্মা
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রবেশ সংরক্ষিত, তবে চর আর পুরোনো রেল কলোনিসহ রূপপুর-পাকশীর পদ্মাপাড় ঘুরে দেখার মতো।
পাবনা যে জন্য বিখ্যাত
পাবনা কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে পাবনা শহর মোটামুটি ১৬০ কিলোমিটার। গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী থেকে বাসে যমুনা সেতু আর বাঘাবাড়ী-কাশীনাথপুর সড়ক হয়ে প্রায় ৪ ঘণ্টা লাগে। রেলপথে পাবনা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের ঈশ্বরদী জংশনে কমলাপুর থেকে অনেক আন্তঃনগর ট্রেন যায়, এটি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যস্ততম জংশনগুলোর একটি। সেখান থেকে বাস ও সিএনজি অটোরিকশায় পাবনা যাওয়া যায়। নিয়মিত ফ্লাইটের নিকটতম বিমানবন্দর রাজশাহী ও যশোর।
হাট ও বাজার
- সুজানগর হাট
- দেশের শীর্ষ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী উপজেলার কেন্দ্র। ফসল তোলার পরের মৌসুমে এখানে বস্তায় বস্তায় পেঁয়াজ ভরে দেশের নানা বাজারে পাঠানো হয়।
- সিলিমপুর লিচুর বাজার, ঈশ্বরদী
- মে-জুনে এই পাইকারি বাজারে ট্রাকভর্তি বোম্বাই, চায়না-৩ আর দেশি জাতের লিচু কেনাবেচা হয়।
- বনগ্রাম হাট, সাঁথিয়া
- পাবনা জেলার সবচেয়ে বড় গ্রামীণ হাটগুলোর একটি। কৃষকেরা পেঁয়াজ, অন্যান্য ফসল আর গবাদিপশু বিক্রি করতে আনেন।
এক নজরে পাবনা
মিডমার্টে পাবনা-এর দোকান
পাবনা থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
পাবনা-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনপাবনা নিয়ে প্রশ্ন
পাবনা-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
পাবনা থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনরাজশাহী বিভাগের আরও জেলা
- বগুড়া প্রাচীন পুণ্ড্রনগর, দই আর উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার
- জয়পুরহাট লতিরাজ, আলু আর দেশের বড় চিনিকলের জেলা
- নওগাঁ বরেন্দ্রের শস্যভান্ডার, পাহাড়পুর আর আম্রপালির দেশ
- নাটোর রানী ভবানীর রাজবাড়ি, চলনবিল আর কাঁচাগোল্লার নাটোর
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের রাজধানী, গৌড়ের সুলতানি মসজিদ আর গম্ভীরার দেশ
- রাজশাহী পদ্মাপাড়ের রেশম নগরী: আম, মন্দির আর শিক্ষার শহর
- সিরাজগঞ্জ তাঁত, দুধ আর যমুনার ওপরের সেতুর জেলা
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Pabna District
- Wikipedia — Pabna District (BBS Census 2022 final enumerated population and literacy)
- Bangladesh Bureau of Statistics — Population and Housing Census 2022
- The Daily Star — Pabna farmers eying bumper onion cultivation
- The Daily Star — Bumper litchi harvest likely in Pabna
- হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, পাকশী — ছবি: Azim Khan Ronnie · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- জোড় বাংলা মন্দির, পাবনা শহর — ছবি: TH polash · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা