রাজশাহী সম্পর্কে
দেশের পশ্চিমে পদ্মার ধারে রাজশাহী, নদীর ওপারে ভারত। জেলার উত্তরাংশ তানোর আর গোদাগাড়ীর দিকে বরেন্দ্র অঞ্চলের লাল উঁচু মাটিতে উঠে গেছে, আর নদীতীরের চারঘাট আর বাঘা সমতল ও উর্বর। পদ্মা, পশ্চিম সীমানার মহানন্দা আর ছোট বড়াল ও শিবা নদী এখানকার ভূপ্রকৃতি গড়েছে। গ্রীষ্মে এটি দেশের সবচেয়ে গরম এলাকাগুলোর একটি, আর শীতও বেশ কড়া।
রাজশাহী শহর বিভাগীয় সদর আর শিক্ষার কেন্দ্র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজ, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আর অসংখ্য স্কুল মিলে শহরটিতে শিক্ষার্থী-শহরের আবহ। দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহরগুলোর একটি হিসেবেও রাজশাহী প্রশংসিত। সূর্যাস্তে নদীপাড়ের বাঁধ, হাঁটার পথ আর "টি-বাঁধ" পরিবারের ভিড়ে ভরে যায়। রেশম চাষ আর রেশম বুননের জন্য রাজশাহীকে বলা হয় "রেশম নগরী", আর বাগানের কারণে জেলাটি দেশের বড় আম অঞ্চলগুলোর একটি।
ইতিহাস
শহরটি দীর্ঘদিন রামপুর বোয়ালিয়া নামে পরিচিত ছিল। "রাজশাহী" নাম, যার মোটামুটি অর্থ রাজকীয় এলাকা, প্রথমে ব্যবহৃত হতো একটি বড় রাজস্ব এলাকার জন্য। ব্রিটিশরা ১৭৭২ সালে রাজশাহী জেলা গঠন করে, শুরুতে প্রশাসন চলত নাটোর থেকে। ১৮২৫ সালে সদর রামপুর বোয়ালিয়ায় সরে আসে, আর নদীতীরে ছিল ওলন্দাজ ও পরে ইংরেজদের রেশম কুঠি। এর চেয়ে অনেক পুরোনো শাহ মখদুম রূপোশের মাজার; প্রচলিত বিশ্বাসে তেরো বা চৌদ্দ শতকে এই সুফি সাধক অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। সুলতান নাসিরুদ্দিন নুসরত শাহের আমলে ১৫২৩–২৪ সালে নির্মিত বাঘা মসজিদও জেলায় সংরক্ষিত আছে।
১৯১০ সালে স্থানীয় পণ্ডিতেরা বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন, যার জাদুঘর বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলকে ক্যাম্প বানিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে। ১৯৬৯ সালে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গিয়ে নিহত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে সারা দেশ স্মরণ করে।
অর্থনীতি ও জীবিকা
আম জেলার গর্ব। বাঘা, চারঘাট, পুঠিয়া, গোদাগাড়ী আর পবায় বিপুল পরিমাণে ফজলি, ল্যাংড়া, ক্ষীরশাপাত, গোপালভোগ আর আম্রপালি হয়, আর পুঠিয়ার বানেশ্বর হাট দেশের ব্যস্ততম আমের বাজারগুলোর একটি। বরেন্দ্রের জমিতে ধান, গম আর ক্রমশ বেশি করে ফলের বাগান ও ড্রাগন ফল হচ্ছে। বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের সদর দপ্তর এখানে, আর সপুরা এলাকার রেশম কারখানা ও শোরুমে শাড়ি, পাঞ্জাবি আর স্কার্ফ বোনা হয়। পদ্মার মাছ, শিক্ষা আর সেবা খাতও অর্থনীতির অংশ।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
রাজশাহী সিল্কের শাড়ি সারা দেশে প্রিয় উপহার। রাস্তার ধারের সকালের নাশতা কলাইয়ের রুটি: মাটির খোলায় সেঁকা মাষকলাইয়ের মোটা রুটি, ঝাল ভর্তা দিয়ে খাওয়া হয়, পাশের চাঁপাইনবাবগঞ্জেও যার একই কদর। শিক্ষার্থী আর সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো গান আর নাটকের প্রাণবন্ত চর্চা ধরে রেখেছে, আর পদ্মাপাড়ের পহেলা বৈশাখ বড় আয়োজন। কথ্য ভাষা বরেন্দ্রি ধাঁচের। তানোর আর গোদাগাড়ীর বরেন্দ্র গ্রামে সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস।
রাজশাহী-এর দর্শনীয় স্থান
-
পুঠিয়া মন্দির কমপ্লেক্স
শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্বে পুঠিয়ার জমিদারদের মন্দির আর প্রাসাদের সমাহার। শিবসাগর দিঘির পাশের উঁচু শিবমন্দির, পোড়ামাটিতে মোড়া গোবিন্দ মন্দির আর রাজবাড়ি মিলে এটি দেশের সেরা মন্দির-স্থানগুলোর একটি।
-
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর
১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত, বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো জাদুঘর। পাল ও সেন যুগের পাথরের ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক, মুদ্রা আর শিলালিপি আছে, যার অনেকগুলো বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে পাওয়া।
-
বাঘা মসজিদ
বাঘা উপজেলায় বড় দিঘির পাশে ১৫২৩–২৪ সালের দশ গম্বুজের ইটের মসজিদ, দেয়াল ভরা পোড়ামাটির ফুলের নকশা। আমবাগানের পথে জনপ্রিয় যাত্রাবিরতি।
-
পদ্মাপাড় ও টি-বাঁধ
শহরের নদীতীরের হাঁটার পথ আর ইংরেজি "টি" আকৃতির বাঁধ। সূর্যাস্ত দেখা, চরে নৌকাভ্রমণ আর সন্ধ্যার নাশতার জায়গা।
-
শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)-এর মাজার
রাজশাহী শহরের কেন্দ্রে নদীর কাছে শহরের পৃষ্ঠপোষক সাধকের দরগাহ। বছরজুড়ে, বিশেষ করে বার্ষিক ওরসে ভক্তদের ভিড় থাকে।
রাজশাহী যে জন্য বিখ্যাত
রাজশাহী কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে রাজশাহী মোটামুটি ২৫০ কিলোমিটার। গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী থেকে বাসে যমুনা সেতু ও নাটোর হয়ে প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লাগে। কমলাপুর থেকে সিল্কসিটি, পদ্মা, ধূমকেতু ও বনলতা এক্সপ্রেসসহ আন্তঃনগর ট্রেনে প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টায় রাজশাহী পৌঁছানো যায়। শাহ মখদুম বিমানবন্দরে ঢাকা থেকে প্রতিদিন ফ্লাইট আছে, সময় লাগে এক ঘণ্টার কম।
হাট ও বাজার
- বানেশ্বর আমের হাট, পুঠিয়া
- রাস্তার পাশের এই পাইকারি বাজার জুন-জুলাইয়ে আমের ঝুড়িতে ভরে যায়। দেশের নানা প্রান্তের ব্যবসায়ীরা ফজলি, ল্যাংড়া আর ক্ষীরশাপাত কিনতে আসেন।
- সাহেব বাজার
- রাজশাহী শহরের কেন্দ্রীয় বাজার: কাপড়, মিষ্টি, গৃহস্থালি জিনিস আর প্রধান কেনাকাটার রাস্তা।
- সপুরার রেশম কারখানা ও শোরুম
- রেশম বুনন আর খুচরা বিক্রির এলাকা। এখানে তাঁতে কাজ দেখা যায়, আর রাজশাহী সিল্কের শাড়ি, পাঞ্জাবি ও গজ হিসেবে কাপড় কেনা যায়।
এক নজরে রাজশাহী
মিডমার্টে রাজশাহী-এর দোকান
রাজশাহী থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
রাজশাহী-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনরাজশাহী নিয়ে প্রশ্ন
রাজশাহী-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
রাজশাহী থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনরাজশাহী বিভাগের আরও জেলা
- বগুড়া প্রাচীন পুণ্ড্রনগর, দই আর উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার
- জয়পুরহাট লতিরাজ, আলু আর দেশের বড় চিনিকলের জেলা
- নওগাঁ বরেন্দ্রের শস্যভান্ডার, পাহাড়পুর আর আম্রপালির দেশ
- নাটোর রানী ভবানীর রাজবাড়ি, চলনবিল আর কাঁচাগোল্লার নাটোর
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের রাজধানী, গৌড়ের সুলতানি মসজিদ আর গম্ভীরার দেশ
- পাবনা পদ্মা-যমুনার মাঝে পেঁয়াজ, লিচু আর ঘিয়ের পাবনা
- সিরাজগঞ্জ তাঁত, দুধ আর যমুনার ওপরের সেতুর জেলা
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Rajshahi District
- Wikipedia — Rajshahi District (BBS Census 2022 final enumerated population and literacy)
- Bangladesh Bureau of Statistics — Population and Housing Census 2022
- Banglapedia — Varendra Research Museum
- Banglapedia — Bagha Mosque
- শিবমন্দির, পুঠিয়া — ছবি: Tanweer Morshed · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- রাজশাহীর পদ্মা — ছবি: Moheen Reeyad · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা