বাগেরহাট সম্পর্কে
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে, যেখানে মাটি ভেঙে অসংখ্য জোয়ার-ভাটার নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে, সেখানেই বাগেরহাট জেলা। পশ্চিমে খুলনা, উত্তরে গোপালগঞ্জ ও নড়াইল, আর পূর্বে চওড়া বলেশ্বর নদী একে পিরোজপুর ও বরগুনা থেকে আলাদা করেছে। পশুর, মধুমতী, ভৈরবসহ ছোট-বড় খাল জোয়ারের পানি অনেক ভেতর পর্যন্ত নিয়ে আসে। দক্ষিণের মোংলা ও শরণখোলা উপজেলা সরাসরি সুন্দরবনের সঙ্গে লাগোয়া।
জেলাটি মূলত দুটি ভিন্ন কারণে বিখ্যাত। বাগেরহাট শহরের আশপাশে ছড়িয়ে আছে পনেরো শতকে খান জাহান আলীর গড়া এক নগরীর ইটের মসজিদ, দিঘি আর পথ, যা ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ঐতিহাসিক মসজিদের শহর হিসেবে স্থান পায়। আর একটু দক্ষিণে মোংলা, দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাস সুন্দরবনে নৌভ্রমণের সবচেয়ে প্রচলিত যাত্রাস্থল।
এই দুইয়ের মাঝে শান্ত গ্রামাঞ্চল জুড়ে নারকেল বাগান, সুপারি বাগান আর অগভীর ঘের। উত্তরের মিঠা পানির ঘেরে চাষ হয় গলদা চিংড়ি, উপকূলের কাছে লোনা পানিতে বাগদা। ঐতিহ্য, বন আর পানিনির্ভর চাষের এই মিশ্রণই বাগেরহাটকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
ইতিহাস
পনেরো শতকের প্রথমার্ধে সুফি সাধক ও প্রশাসক খান জাহান আলী এখানকার জঙ্গল পরিষ্কার করে একটি পরিকল্পিত জনপদ গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসে খলিফাতাবাদ নামে পরিচিত। তিনি রাস্তা বানান, পানীয় জলের জন্য ঘোড়া দিঘি ও ঠাকুর দিঘির মতো বড় দিঘি খনন করান এবং মজবুত ইটের স্থানীয় রীতিতে বহু মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁর সমাধির শিলালিপি অনুযায়ী তিনি ১৪৫৯ সালে মারা যান। তাঁর কাজকে ঘিরে যে শহর গড়ে ওঠে, সেটিই আজকের বাগেরহাট। নামের উৎপত্তি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিক কাহিনি প্রচলিত, কোনোটিই নিশ্চিত নয়।
ব্রিটিশ আমলে এলাকাটি প্রথমে যশোর ও পরে খুলনা জেলার অংশ ছিল; মোরেলগঞ্জের নাম এসেছে উনিশ শতকের ইংরেজ জমিদার মোরেল পরিবারের নাম থেকে। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে চালু হওয়া একটি নোঙরস্থান থেকেই পরে মোংলা বন্দর গড়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাগেরহাট ছিল ৯ নম্বর সেক্টরে; শাঁখারীকাঠি হাটসহ বিভিন্ন স্থানের গণকবর সেই সময়ের হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী। ১৯৮৪ সালে বাগেরহাট পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
অর্থনীতি ও জীবিকা
চিংড়ি চাষ এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ফকিরহাট, চিতলমারী, মোল্লাহাট ও বাগেরহাট সদর গলদা চিংড়ির প্রধান এলাকা, আর রামপাল ও মোংলায় লোনা পানির ঘেরে বাগদা চাষ হয়। উৎপাদনের বড় অংশ প্রক্রিয়াজাত কারখানা হয়ে বিদেশে রপ্তানি হয়। ঘেরের আইলে ফলানো সবজি, নারকেল, সুপারি ও ধান কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস। মোংলা বন্দর, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র শিল্পখাতে কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। মৌসুমি অনুমতি নিয়ে সুন্দরবন থেকে মধু, মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করা হয়, আর মসজিদের শহর ও বনকে ঘিরে পর্যটনও ক্রমে বাড়ছে।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
এখানকার রান্নায় পানি আর নারকেলের প্রভাব স্পষ্ট: নারকেলের দুধে রাঁধা চিংড়ির মালাইকারি, নদীর মাছের ঝোল, শীতে নারকেলের পিঠা। প্রতি বছর খান জাহান আলীর মাজারে বার্ষিক মেলায় বিপুল মানুষের সমাগম হয়, আর মাজারের পাশে ঠাকুর দিঘির কুমিরকে খাবার দেওয়ার প্রথা চলে আসছে বহু প্রজন্ম ধরে। জেলায় হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের বাস, দুর্গাপূজা ও ঈদ দুটোই ঘটা করে পালিত হয়।
দক্ষিণের জীবনযাত্রা বনের ওপর নির্ভরশীল। মৌসুমে মৌয়াল, জেলে আর বাওয়ালিরা এখনো সুন্দরবনে যান। দুই ধর্মের মানুষের কাছে সমান সম্মানিত বনদেবী বনবিবির উদ্দেশে তাঁদের গান ও প্রার্থনা স্থানীয় লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাগেরহাট-এর দর্শনীয় স্থান
-
ষাট গম্বুজ মসজিদ
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মধ্যযুগীয় মসজিদ, পনেরো শতকে খান জাহান আলীর সময়ে নির্মিত। পাথরের সারি সারি স্তম্ভের ওপর রয়েছে ৭৭টি নিচু গম্বুজ। এটি বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকার কেন্দ্রবিন্দু, পাশের ছোট জাদুঘরে পুরো মসজিদ-নগরীর পরিচয় পাওয়া যায়।
-
খান জাহান আলীর মাজার ও ঠাকুর দিঘি
ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে বিশাল দিঘির পাড়ে নগরীর প্রতিষ্ঠাতার গম্বুজওয়ালা সমাধি। মাজারটি জীবন্ত তীর্থস্থান, আর দিঘিটি এর কুমিরের জন্য বিখ্যাত।
-
নয় গম্বুজ মসজিদ ও সিংগাইর মসজিদ
একই সময়ের ছোট দুটি মসজিদ। ঠাকুর দিঘির পাড়ে নয় গম্বুজ মসজিদ আর ষাট গম্বুজের উল্টো দিকে এক গম্বুজের সিংগাইর মসজিদে খান জাহানের কারিগরদের পোড়ামাটির অলংকরণ কাছ থেকে দেখা যায়। হেঁটেই ঘুরে আসা যায়।
-
মোংলা বন্দর
পশুর নদীর তীরে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর, যেখানে বনঘেরা পাড়ের পাশে সমুদ্রগামী জাহাজ নোঙর করে। পূর্ব সুন্দরবনের দিনভর বা কয়েক দিনের ভ্রমণ সাধারণত এখান থেকেই শুরু হয়।
-
করমজল, সুন্দরবন
মোংলা থেকে অল্প নৌপথে বন বিভাগের এই কেন্দ্রে ম্যানগ্রোভের ভেতর দিয়ে কাঠের হাঁটাপথ, চিত্রা হরিণ, বানর আর কুমির প্রজনন কেন্দ্র রয়েছে। আধা দিনে সুন্দরবন দেখার সবচেয়ে সহজ উপায় এটি।
বাগেরহাট যে জন্য বিখ্যাত
বাগেরহাট কীভাবে যাবেন
পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকার সায়েদাবাদ ও গাবতলী থেকে বাস ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ ও ফকিরহাট হয়ে মোটামুটি চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায় বাগেরহাট পৌঁছায়। ঢাকা থেকে ট্রেনে খুলনা গিয়ে সেখান থেকে প্রায় এক ঘণ্টার সড়কপথে বাগেরহাট আসা যায়; আকাশপথে যশোর বিমানবন্দরে নেমেও বাস বা গাড়িতে আসা সম্ভব। বাগেরহাট শহর থেকে মোংলা সড়কপথে প্রায় এক ঘণ্টা।
হাট ও বাজার
- ফলতিতা বাজার, ফকিরহাট
- খুলনা মহাসড়কের পাশে দক্ষিণ-পশ্চিমের অন্যতম পরিচিত গলদা চিংড়ি ও চিংড়ির রেণুর বাজার। মৌসুমে ঘের মালিকদের কাছ থেকে ব্যবসায়ী ও ডিপোগুলো এখানে চিংড়ি কেনে।
- বারাকপুর বাজার, বাগেরহাট সদর
- শহরের কাছের ব্যস্ত মাছ ও চিংড়ির বাজার; এখানকার ব্যবসায়ীদের নিজস্ব সমিতি আছে, আহরণের মৌসুমে চিংড়ির কেনাবেচা জমজমাট থাকে।
- চিতলমারী বাজার
- চিংড়ি চাষের জন্য পরিচিত উপজেলার প্রধান বাজার; নদীর মাছ, ঘেরের আইলে ফলানো সবজি আর স্থানীয় নারকেল কেনার ভালো জায়গা।
এক নজরে বাগেরহাট
মিডমার্টে বাগেরহাট-এর দোকান
বাগেরহাট থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
বাগেরহাট-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনবাগেরহাট নিয়ে প্রশ্ন
বাগেরহাট-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
বাগেরহাট থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনখুলনা বিভাগের আরও জেলা
- চুয়াডাঙ্গা খেজুরের গুড়, পান আর দর্শনা চিনিকলের সীমান্ত জেলা
- যশোর ফুলের রাজধানী, খেজুর গুড় আর বেনাপোল সীমান্তের জেলা
- ঝিনাইদহ সুলতানি মসজিদ, নলডাঙ্গার মন্দির আর কালীগঞ্জের বিশাল বটগাছ
- খুলনা চিংড়ির নদীশহর, সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার
- কুষ্টিয়া লালন ও রবীন্দ্রনাথের ভূমি, তিলের খাজা আর কুমারখালীর তাঁত
- মাগুরা রাজা সীতারামের দেশ — পাটের খেত, পেড়া সন্দেশ আর খামারপাড়ার দই
- মেহেরপুর মুজিবনগর — যেখানে শপথ নিয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার
- নড়াইল এস এম সুলতানের চিত্রা নদীর দেশ, নৌকাবাইচ আর ক্রিকেটারদের জেলা
- সাতক্ষীরা আগাম আম, সফট-শেল কাঁকড়া আর পশ্চিম সুন্দরবন
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Bagerhat District
- BBS Population and Housing Census 2022, National Report (Vol. 1, final)
- Wikipedia — Bagerhat District
- UNESCO World Heritage — Historic Mosque City of Bagerhat
- ষাট গম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট — ছবি: Anup Sadi · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- খান জাহান আলীর মাজার — ছবি: Md.Mijanur Rahman1985 · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা