বরিশাল সম্পর্কে
গঙ্গা-মেঘনা ব-দ্বীপের মাঝখানে বরিশাল জেলা, ঢাকা থেকে সোজা দক্ষিণে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে। এই জেলার নামেই পুরো বরিশাল বিভাগের নাম। প্রায় ২,৭৮৫ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ১০টি উপজেলা — পূর্বে চওড়া মেঘনার পাড়ে হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ, আর পশ্চিমে খাল আর পেয়ারাবাগানে ঘেরা বানারীপাড়া ও উজিরপুর। জেলা সদর বরিশাল নগরী কীর্তনখোলা নদীর পশ্চিম পাড়ে; সিটি কর্পোরেশন এলাকায় থাকে জেলার মোট ২৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষের প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার।
এখানে সবকিছুই পানিকে ঘিরে। মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, কীর্তনখোলা, সন্ধ্যা, তেঁতুলিয়া আর অসংখ্য ছোট নদী ও জোয়ার-ভাটার খাল জমিকে ভাগ করেছে নিচু, উর্বর দ্বীপে। পুরোনো প্রবাদেই পরিচয় মেলে — "ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল"; অনেকে একে প্রাচ্যের ভেনিসও বলেন। নৌকা এখনও প্রতিদিনের বাহন, আর দেশের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দর থেকে প্রতি সন্ধ্যায় বহুতল লঞ্চ ছাড়ে ঢাকার পথে।
শিক্ষাতেও বরিশাল এগিয়ে। ২০২২ সালের জনশুমারিতে সাত বছর ও তার বেশি বয়সীদের সাক্ষরতার হার প্রায় ৮০ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। কুয়াকাটা সৈকত, ভোলার চর কিংবা ঝালকাঠি-পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারার হাটে যাওয়া বেশিরভাগ পর্যটকের যাত্রাও শুরু হয় বরিশাল হয়ে।
ইতিহাস
মধ্যযুগে এ অঞ্চল ছিল চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অংশ; মাধবপাশায় সেই রাজাদের খনন করা দিঘি ও স্থাপনার চিহ্ন আজও আছে। ব্রিটিশ আমলে ১৭৯৭ সালে আঠারো শতকের জমিদার আগা বাকের খাঁর নামে বাকেরগঞ্জ জেলা গঠিত হয়; ১৮০১ সালে সদর দপ্তর সরে আসে বরিশাল শহরে, পরে জেলাও শহরের নাম নেয়। "বরিশাল" নামের উৎস নিয়ে নানা মত — কেউ বলেন ঔপনিবেশিক আমলের বড় বড় লবণের গোলা থেকে, কেউ বলেন বিশাল শাল গাছ থেকে, আবার পর্তুগিজ এক প্রেমকাহিনির গল্পও প্রচলিত। উনিশ শতকের ইংরেজ কর্মকর্তারা মোহনার ওপর শোনা রহস্যময় গুমগুম শব্দকে লিখে গেছেন "বরিশাল গানস" নামে।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতিরও কেন্দ্র ছিল এই শহর। অশ্বিনীকুমার দত্ত ১৮৮৯ সালে ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এখানে স্বদেশি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন; চারণকবি মুকুন্দ দাস গানে গানে প্রতিবাদ ছড়িয়েছেন। অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের পৈতৃক বাড়ি বানারীপাড়ার চাখারে। কবি জীবনানন্দ দাশ ও সুফিয়া কামালের জন্মও এই জেলায়। ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি বরিশাল বিভাগীয় সদর দপ্তর হয়।
অর্থনীতি ও জীবিকা
জেলার অর্থনীতির ভিত কৃষি আর মাছ। মাঠে আমন ও বোরো ধানই প্রধান, আর দেশজুড়ে বরিশালের সুপারি, নারকেল, আমড়া ও পেয়ারার নাম আছে — পেয়ারা বেশি হয় বানারীপাড়ার খালপাড়ের বাগানে। মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও কীর্তনখোলা থেকে আসে ইলিশ; মৌসুমে নগরীর পোর্ট রোডের পাইকারি মোকাম থেকে ট্রাকে মাছ যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায়। এর সঙ্গে আছে গৌরনদীর দুগ্ধশিল্প, নৌপরিবহন ও লঞ্চ নির্মাণ, চালকল আর প্রবাসী আয়। ২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে পণ্য পরিবহন অনেক দ্রুত হয়েছে।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
বরিশালের রান্নায় মাছ, নারকেল আর ভাতের রাজত্ব — ইলিশের ঝোল ও ভাজা, নারকেলের দুধে চিংড়ি, আর দই দিয়ে চিড়া-মুড়ি। গৌরনদীর ঘন, হালকা টক দই মাটির হাঁড়িতে পাতেন বংশপরম্পরায় কাজ করা ময়রারা। বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা তার সুর আর সরস কথার জন্য সারা দেশে পরিচিত; নাটক-সিনেমা আর কৌতুকে এই ভাষার কদর আলাদা।
নদীতে নৌকাবাইচ, জারি-সারি গান আর শীতে চরমোনাইয়ের মাহফিল এখানকার জীবনের অংশ। জীবনানন্দ দাশের "রূপসী বাংলা" আর ধানসিঁড়ি নদীর কবিতা গোটা দেশের মানুষের মনে গ্রামবাংলার ছবি এঁকে দিয়েছে।
বরিশাল-এর দর্শনীয় স্থান
-
বায়তুল আমান জামে মসজিদ, গুঠিয়া
নগরী থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়ায় মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্স, নির্মাণ শেষ হয় ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি। গম্বুজ, উঁচু মিনার, পুকুর আর সাজানো বাগানের জন্য এটি জেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান; রাতে আলোয় সাজানো থাকে।
-
দুর্গাসাগর দিঘি
বাবুগঞ্জের মাধবপাশায়, নগরী থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে ১৭৮০ সালে খনন করা বিশাল দিঘি, চন্দ্রদ্বীপের রানি দুর্গাবতীর নামে। মাঝখানে গাছে ঢাকা একটি দ্বীপ, আর শীতে আসে অতিথি পাখি।
-
অক্সফোর্ড মিশন গির্জা
নগরীর বগুড়া রোডে ১৯০৩ সালে অ্যাংলিকান অক্সফোর্ড মিশনের হাতে শুরু হওয়া লাল ইটের এপিফানি গির্জা দেশের অন্যতম বৃহৎ গির্জা। তালগাছ আর পুকুরে ঘেরা শান্ত প্রাঙ্গণ; প্রার্থনার সময় বাদে সাধারণত দর্শনার্থীরা যেতে পারেন।
-
সাতলার শাপলা বিল
উজিরপুর উপজেলার এই জলাভূমিতে বর্ষার শেষ থেকে শরৎ পর্যন্ত লাল-সাদা শাপলায় পানি ঢেকে যায়। ভোরে যাওয়াই ভালো, তখন ফুল ফোটা থাকে আর মাঝিরা নৌকায় ঘুরিয়ে দেখান।
-
শেরে বাংলা স্মৃতি জাদুঘর, চাখার
বানারীপাড়ার চাখারে এ কে ফজলুল হকের পৈতৃক গ্রামে ছোট এই জাদুঘরে তাঁর ব্যবহৃত জিনিস ও আলোকচিত্র রাখা আছে; ভাসমান পেয়ারার হাটে যাওয়ার পথে থামার মতো জায়গা।
বরিশাল যে জন্য বিখ্যাত
বরিশাল কীভাবে যাবেন
পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে বাসে বরিশাল যেতে এখন মোটামুটি ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা লাগে; সায়েদাবাদ, গাবতলী ও যাত্রাবাড়ী থেকে বাস ছেড়ে নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল বা রূপাতলীতে পৌঁছায়। পুরোনো ও প্রিয় পথ সদরঘাট থেকে রাতের লঞ্চ — প্রায় ৭ থেকে ৯ ঘণ্টায় কীর্তনখোলার পাড়ে বরিশাল নদীবন্দরে পৌঁছায়; ঈদের আগে কেবিন আগেভাগে শেষ হয়ে যায়। নগরীর উত্তরে রহমতপুরে বরিশাল বিমানবন্দর, ঢাকা থেকে বিমানে প্রায় ৪০ মিনিট। বরিশালে রেলপথ নেই।
হাট ও বাজার
- পোর্ট রোড মৎস্য মোকাম
- কীর্তনখোলার পাড়ে বিভাগের সবচেয়ে বড় ইলিশের পাইকারি বাজার। ভোরে ট্রলার থেকে মাছ নামে, বরফে প্যাক করে পাঠানো হয় ঢাকায়; আগস্ট থেকে অক্টোবর সবচেয়ে ব্যস্ত।
- চকবাজার ও সদর রোড
- শহরের পুরোনো বাণিজ্যকেন্দ্র — সরু গলিতে কাপড়, সোনা, জুতা, বাসনকোসন আর মিষ্টির দোকান; কাছেই হাটখোলার পাইকারি দোকান।
- গৌরনদী বাজার ও বাসস্ট্যান্ড
- ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে সারি সারি দইয়ের দোকান; যাত্রীরা থেমে মাটির হাঁড়িতে দই কিনে বাড়ি নিয়ে যান।
এক নজরে বরিশাল
মিডমার্টে বরিশাল-এর দোকান
বরিশাল থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
বরিশাল-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনবরিশাল নিয়ে প্রশ্ন
বরিশাল-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
বরিশাল থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনবরিশাল বিভাগের আরও জেলা
- বরগুনা বিষখালী আর বলেশ্বর যেখানে সাগরে মেশে: ইলিশ, ম্যানগ্রোভ আর রাখাইন তাঁত
- ভোলা দেশের সবচেয়ে বড় দ্বীপ — ইলিশ আর মহিষের দইয়ের ভোলা
- ঝালকাঠি সুস্বাদু পেয়ারা আর শীতলপাটির দেশ, খালে খালে ভাসমান হাট
- পটুয়াখালী সাগরকন্যা পটুয়াখালী: কুয়াকাটার সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, তরমুজ আর পায়রা বন্দর
- পিরোজপুর ভাসমান পেয়ারার হাট, কাঠ, নার্সারি আর পানিতে ভাসা বাগান
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Barisal District
- BBS Population and Housing Census 2022 — District Report: Barishal
- City Population — Bangladesh administrative divisions (Census 2022 enumerated figures)
- Wikipedia — Barisal District
- বাংলা উইকিপিডিয়া — বরিশাল জেলা (ইউনিয়ন সংখ্যা)
- The Daily Star — Gournadi's yogurt makers
- কীর্তনখোলার পাড়ে বরিশাল নদীবন্দর — ছবি: NiamulMulk · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- গুঠিয়া মসজিদ, উজিরপুর — ছবি: Raian Islam Evan · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা