খাগড়াছড়ি সম্পর্কে
খাগড়াছড়ি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার মধ্যে সবচেয়ে উত্তরের। উত্তর ও পশ্চিম ঘিরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে রাঙ্গামাটি, দক্ষিণ-পশ্চিমে চট্টগ্রাম। জেলা শহর জেলার দীর্ঘতম নদী চেঙ্গীর তীরের উপত্যকায়; ফেনী ও মাইনী নদীর উৎস বা প্রবাহপথও এখানে। জেলায় ৯টি উপজেলা: খাগড়াছড়ি সদর, দীঘিনালা, পানছড়ি, মহালছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি, মানিকছড়ি, মাটিরাঙ্গা, রামগড় ও গুইমারা।
ঢেউখেলানো সবুজ পাহাড় আর সরু উপত্যকার দেশ; বান্দরবানের মতো খাড়া নয়, তবু ব-দ্বীপের সমতল থেকে একেবারে আলাদা জগৎ। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ১৪ হাজার, যার প্রায় অর্ধেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর: সবচেয়ে বড় চাকমা, এরপর ত্রিপুরা ও মারমা, বাকিদের বেশির ভাগ বাঙালি। বৌদ্ধ বিহার, হিন্দু মন্দির, গির্জা ও মসজিদ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি জানান দেয়, আর গ্রামীণ জীবন এখনো পাহাড়ি চাষাবাদ ও সাপ্তাহিক হাটকে ঘিরে।
ইতিহাস
নামের প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো খাগড়া, অর্থাৎ নদীর পাড়ে একসময় ঘন হয়ে জন্মানো নলখাগড়া জাতীয় ঘাস, আর ছড়া, অর্থাৎ পাহাড়ি ঝিরি, এই দুই শব্দের মিলন। শতাব্দীর পর শতাব্দী অঞ্চলটি ত্রিপুরা রাজ্য, আরাকান ও বাংলার সুলতানদের মাঝে আলগাভাবে ঝুলে ছিল। ১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামমাত্র কর্তৃত্ব পেলেও মূলত কর আদায়েই সীমাবদ্ধ ছিল, আর ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম আলাদা জেলা হয়। বর্তমান খাগড়াছড়ি অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামের তৃতীয় ঐতিহ্যবাহী সার্কেল, মং সার্কেলের কেন্দ্র; এর মারমা প্রধান মং রাজার আসন মানিকছড়িতে।
বিশ শতকের শুরুতে খাগড়াছড়ি মহকুমা এবং ১৯৮৩ সালে জেলা হয়। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ফলে স্থানীয় পরিষদ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে রূপ নেয়, যা আজ অনেক স্থানীয় সেবা পরিচালনা করে। জাতীয় ইতিহাসে রামগড়ের বিশেষ স্থান আছে: ১৭৯৫ সালে এখানে গঠিত রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়নকে আজকের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সূচনা হিসেবে ধরা হয়।
অর্থনীতি ও জীবিকা
বেশির ভাগ পরিবারের জীবিকা কৃষি। পাহাড়ের ঢালে জুম চাষে হয় পাহাড়ি ধান, ভুট্টা, তিল, মারফা (শসা), মিষ্টিকুমড়া, মরিচ, আদা ও হলুদ; আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আম, আনারস, কাঁঠাল, লিচু ও লেবুজাতীয় ফলের বাগান দ্রুত বেড়েছে, খাগড়াছড়ির আম এখন দেশজুড়ে বাজারে যায়। বাঁশ, কাঠ ও তাঁত অনেক পরিবারের অবলম্বন, আর সাজেকগামী পর্যটকের স্রোতে পর্যটন আয়ের ক্রমবর্ধমান উৎস। ২০২১ সালে চালু হওয়া রামগড়ে ফেনী নদীর ওপর বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু জেলাকে ত্রিপুরার সাব্রুমের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
সবচেয়ে বড় উৎসব এপ্রিলের মাঝামাঝি নববর্ষ: চাকমাদের বিজু, ত্রিপুরাদের বৈসু আর মারমাদের সাংগ্রাই, পুরো মৌসুমকে একসঙ্গে বলা হয় বৈসাবি। প্রথম দিনে চেঙ্গীসহ বিভিন্ন নদীতে ফুল ভাসানো হয়, পরে চলে পানি খেলা, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা আর ঘরে তৈরি নানা পদ নিয়ে বাড়ি বাড়ি বেড়ানো। এক দিনে বোনা চীবর ভিক্ষুদের দান করার কঠিন চীবর দানের মতো বৌদ্ধ উৎসবও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁত এখানে জীবন্ত শিল্প। চাকমা নারীরা পরেন পিনন ও হাদি, ত্রিপুরা নারীরা রিনাই ও রিসা, সবই ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁতে বোনা, নকশা দেখেই জনগোষ্ঠী চেনা যায়। খাবারে থাকে বাঁশ কোড়ল, বুনো সবজি, গাঁজানো মাছ আর বাঁশের চোঙায় রান্না মাংস; খাগড়াছড়ি শহরের ছোট রেস্তোরাঁয় পর্যটকেরা এসব পদের স্বাদ নিতে পারেন।
খাগড়াছড়ি-এর দর্শনীয় স্থান
-
আলুটিলা গুহা, মাটিরাঙ্গা
খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কের কাছে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে অন্ধকার, সরু প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ। মশাল বা টর্চের আলোয় পাথুরে ঝিরিপথ ধরে হেঁটে পার হতে হয়, আর ওপরের পাহাড়চূড়া থেকে জেলার বিস্তীর্ণ দৃশ্য দেখা যায়।
-
রিছাং ঝরনা
মাটিরাঙ্গা উপজেলায় ঢালু পাথরের গা বেয়ে নামা ঝরনা, পাহাড়ি পথে অল্প হেঁটে পৌঁছাতে হয়; বর্ষা থেকে শরৎ পর্যন্ত পানির প্রবাহ সবচেয়ে বেশি।
-
পার্বত্য জেলা পরিষদ পার্ক
খাগড়াছড়ি শহরের প্রান্তে সাজানো পার্ক, ঝুলন্ত সেতু, লেক আর চারপাশের পাহাড় দেখার জায়গা নিয়ে পরিবারগুলোর প্রিয় গন্তব্য।
-
রামগড়
লেক, চা-বাগান আর বিজিবির সূচনা রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়নের স্মৃতিস্তম্ভসহ সীমান্তশহর; এখানেই ত্রিপুরার সঙ্গে সংযোগকারী মৈত্রী সেতু।
-
সাজেকের প্রবেশপথ
সাজেক ভ্যালি প্রশাসনিকভাবে পাশের রাঙ্গামাটি জেলায়, তবে সড়কপথে যেতে হয় খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা হয়ে; তাই বেশির ভাগ পর্যটক আগে-পরে এক রাত খাগড়াছড়ি শহরে থাকেন।
খাগড়াছড়ি যে জন্য বিখ্যাত
খাগড়াছড়ি কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি শহরে সরাসরি বাস চলে, বেশির ভাগই রাতের; ফেনী ও রামগড় হয়ে সময় লাগে মোটামুটি সাত থেকে আট ঘণ্টা। চট্টগ্রামের অক্সিজেন এলাকা থেকে বাসে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা। জেলায় বিমানবন্দর বা রেলপথ নেই; কাছের বিমানবন্দর চট্টগ্রামে, রেলস্টেশন ফেনীতে। সাজেকসহ দর্শনীয় স্থানে যেতে সাধারণত চাঁদের গাড়ি নামের জিপ ভাড়া করতে হয়। বাংলাদেশি পর্যটকেরা সাধারণত জেলায় অবাধে ঘুরতে পারেন, তবে বিদেশি নাগরিকদের জেলা প্রশাসনের অনুমতি লাগে, আর সাজেকের পথে বাঘাইহাট থেকে নির্দিষ্ট সময়ে সেনা এসকর্টে গাড়িবহর চলার নিয়ম রয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ম বদলায়, তাই যাওয়ার আগে জেনে নিন।
হাট ও বাজার
- খাগড়াছড়ি শহরের বাজার
- জেলার প্রধান বাজার, যেখানে আশপাশের গ্রামের কৃষকেরা পাহাড়ি সবজি, ফল, শুঁটকি ও বাঁশ কোড়ল বিক্রি করেন, আর দোকানে মেলে হাতে বোনা পিনন, হাদি ও চাদর।
- বোয়ালখালী হাট, দীঘিনালা
- জেলার অন্যতম প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র, হাটবারে পাহাড়ি ও বাঙালি ব্যবসায়ীরা জুমের সবজি, ফল, বাঁশ ও বেতের পণ্য নিয়ে আসেন।
- লারমা স্কয়ার বাজার, দীঘিনালা
- প্রতিদিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত বসা বাজার, যেখানে মূলত নারী বিক্রেতারা আশপাশের পাহাড়ের সবজি, ফল, মসলা ও গৃহস্থালি জিনিস বিক্রি করেন।
এক নজরে খাগড়াছড়ি
মিডমার্টে খাগড়াছড়ি-এর দোকান
খাগড়াছড়ি থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
খাগড়াছড়ি-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনখাগড়াছড়ি নিয়ে প্রশ্ন
খাগড়াছড়ি-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
খাগড়াছড়ি থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনচট্টগ্রাম বিভাগের আরও জেলা
- বান্দরবান মেঘে ঢাকা পাহাড়, সাঙ্গু নদী আর দেশের সবচেয়ে উঁচু চূড়াগুলোর জেলা
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া তিতাস নদী, উচ্চাঙ্গসংগীত, ছানামুখী আর পূর্বাঞ্চলের গ্যাসক্ষেত্রের জেলা
- চাঁদপুর পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মিলনস্থলে ইলিশের বাড়ি
- চট্টগ্রাম বন্দর, সবুজ পাহাড় আর মেজবান: বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী
- কুমিল্লা ময়নামতির বৌদ্ধ নিদর্শন, খাদি কাপড় আর সবার চেনা রসমালাই
- কক্সবাজার অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত, মেরিন ড্রাইভ, শুঁটকি আর লবণের মাঠ
- ফেনী ঢাকা-চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার, খন্ডলের মিষ্টির দেশ
- লক্ষ্মীপুর মেঘনার মোহনায় সয়াবিনের খেত, নারকেল আর সুপারির বাগান
- নোয়াখালী মেঘনার বুকে জেগে ওঠা নতুন ভূমি: হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ আর বিখ্যাত উপভাষা
- রাঙ্গামাটি কাপ্তাই হ্রদ, ঝুলন্ত সেতু আর সাজেক: পাহাড়ের হ্রদের জেলা
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Khagrachhari District
- BBS Population and Housing Census 2022 — National Report, Vol. I (enumerated population)
- Wikipedia — Khagrachhari District
- Dhaka Tribune — Permission first for foreigners to visit hilly districts
- রিছাং ঝরনার পথে পাহাড়, খাগড়াছড়ি — ছবি: ANKAN GHOSH DASTIDER · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- পার্বত্য জেলা পরিষদ পার্ক, খাগড়াছড়ি — ছবি: Moheen Reeyad · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা