চট্টগ্রাম সম্পর্কে
চট্টগ্রাম জেলা দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল ধরে বিস্তৃত: উত্তরে ফেনী নদী ও ত্রিপুরা সীমান্ত থেকে দক্ষিণে কক্সবাজার পর্যন্ত, পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আর পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। সন্দ্বীপ দ্বীপ জেলার ১৫টি উপজেলার একটি। ২০২২ সালে জনসংখ্যা ৯০ লাখের বেশি, দেশের দ্বিতীয় জনবহুল জেলা; কর্ণফুলীর উত্তর তীরের চট্টগ্রাম শহর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর ও ব্যস্ততম বন্দর।
ব-দ্বীপের বেশির ভাগ এলাকার মতো সমতল নয়, চট্টগ্রাম পাহাড়ি। উপকূলের সমান্তরালে চলে গেছে নিচু পাহাড়সারি, যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত সীতাকুণ্ড পাহাড়, চন্দ্রনাথে যার উচ্চতা প্রায় ৩৫০ মিটার। মাঝের সমভূমি গড়েছে তিন নদী: পতেঙ্গায় সাগরে মেশা কর্ণফুলী, দক্ষিণে সাঙ্গু, আর কর্ণফুলীর উপনদী হালদা, যা দক্ষিণ এশিয়ায় রুই-কাতলাজাতীয় মাছের হাতে গোনা প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রের একটি হিসেবে বিখ্যাত। এখানকার মানুষ কথা বলেন চাটগাঁইয়া ভাষায়, যা এতটাই আলাদা যে ঢাকা থেকে আসা অনেকে বুঝতেই পারেন না।
ইতিহাস
প্রাকৃতিক পোতাশ্রয়ের কারণে কোনো বাঙালি রাষ্ট্রের অংশ হওয়ার বহু আগেই চট্টগ্রাম ছিল বাণিজ্যবন্দর: নবম শতকের দিক থেকে আরব বণিকেরা এখানে আসতেন। পরে অঞ্চলটি বাংলার সুলতান, ত্রিপুরার রাজা ও আরাকানিদের হাতবদল হয়, আর ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে পর্তুগিজ দস্যুরা সন্দ্বীপ দখল করে উপকূলে উৎপাত চালাত। ১৬৬৬ সালে মোগল সুবাদার শায়েস্তা খান বন্দরটি জয় করে প্রশাসন গড়ে তোলেন, সেই সূত্রে চট্টগ্রাম দেশের প্রাচীনতম জেলা। ১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এর নিয়ন্ত্রণ পায়, আর ১৮৬০ সালে পার্বত্য অঞ্চল আলাদা জেলা হয়।
স্বাধীনতা সংগ্রামে এই জেলার বিশেষ স্থান। ১৯৩০ সালে স্কুলশিক্ষক সূর্য সেন, সবার মাস্টারদা, শহরের ব্রিটিশ অস্ত্রাগারে সশস্ত্র অভিযান চালান; ১৯৩৪ সালে যে ফাঁসির মঞ্চে তাঁকে হত্যা করা হয়, তা কেন্দ্রীয় কারাগারে সংরক্ষিত আছে। ১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ কর্ণফুলীর তীরে কালুরঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়। জেলায় উল্লেখযোগ্য হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বাস, আর বাংলাপিডিয়া রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলের প্রাচীন বৌদ্ধ নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেছে।
অর্থনীতি ও জীবিকা
দেশের সমুদ্রপথের বাণিজ্যের সিংহভাগ সামলায় চট্টগ্রাম বন্দর, আর অর্থনীতির বড় অংশই গড়ে উঠেছে একে ঘিরে: রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের পোশাক কারখানা, শিপিং ও ফ্রেইট প্রতিষ্ঠান, ইস্পাত ও সিমেন্ট কারখানা এবং সীতাকুণ্ড উপকূলের জাহাজভাঙা শিল্প। নদীতীরের পুরোনো পাইকারি এলাকা খাতুনগঞ্জ ও আসাদগঞ্জ সারা দেশের ভোজ্যতেল, চিনি, মসলা, ডাল ও শুঁটকির দাম ঠিক করে দেয়। শহরের বাইরে কৃষকেরা ধান, সবজি ও পান চাষ করেন, ফটিকছড়ির পাহাড়ে আছে চা-বাগান, আর উপকূলে লবণ ও মাছ।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
খাবার নিয়ে চট্টগ্রামের মানুষের গর্বের শেষ নেই। চাটগাঁইয়া মেজবান হলো বিশাল ডেকচিতে রান্না করা ঝাল, সমৃদ্ধ গরুর মাংসকে ঘিরে সামাজিক ভোজ, যেখানে স্মরণসভা বা উৎসবে শত শত অতিথিকে খাওয়ানো হয়। কালা ভুনা (ধীরে ভাজা প্রায় কালো রঙের গরুর মাংস), শুঁটকির তরকারি আর পুরোনো শহরের বেকারির বেলা বিস্কুটও মানুষ এখান থেকে নিয়ে যান।
জেলার উৎসবে মিশে আছে নানা ধর্ম: কালো নরম খোলসের কচ্ছপের পুকুরসহ বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার আর শাহ আমানতের মাজারে মুসলমান ভক্তদের ভিড়; সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ মন্দিরে শিবচতুর্দশীর বড় মেলা; বৌদ্ধরা উদযাপন করেন প্রবারণা ও কঠিন চীবর দান। শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের গাওয়া চাটগাঁইয়া আঞ্চলিক গান সারা দেশে জনপ্রিয়, আর প্রতি বৈশাখে শহরে অনুষ্ঠিত জব্বারের বলীখেলার শুরু ১৯০৯ সালে।
চট্টগ্রাম-এর দর্শনীয় স্থান
-
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত
শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে কর্ণফুলীর মোহনায় সমুদ্রসৈকত, যেখান থেকে বন্দরে ঢোকার অপেক্ষায় থাকা বড় জাহাজ দেখা যায়। সূর্যাস্ত আর প্রমেনেডের খাবারের দোকানের জন্য এটি শহরবাসীর প্রিয় সান্ধ্য গন্তব্য।
-
চন্দ্রনাথ পাহাড়, সীতাকুণ্ড
সীতাকুণ্ড পাহাড়সারির সর্বোচ্চ চূড়া, চূড়ায় শিবমন্দির; বনের ভেতর দিয়ে লম্বা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। ঘণ্টা দুয়েকের এই চড়াইয়ের পুরস্কার সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত দৃশ্য।
-
গুলিয়াখালী সৈকত, সীতাকুণ্ড
ঘাসে ঢাকা জোয়ার-ভাটার কাদাচর, মাঝে মাঝে ছোট খাল আর কেওড়া গাছের সারি; বালুকাময় সৈকত থেকে একেবারে আলাদা এক উপকূল।
-
ফয়’স লেক
১৯২৪ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের তৈরি পাহাড়তলীর পাহাড়ঘেরা জলাধার, এখন হ্রদকেন্দ্রিক বিনোদন ও রিসোর্ট এলাকা।
-
কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধিক্ষেত্র
শহরের ভেতরে শান্ত, পরিপাটি সমাধিক্ষেত্র, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বার্মা অভিযানে নিহত সৈনিকদের কবর রয়েছে।
-
জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর
১৯৭৪ সালে আগ্রাবাদে চালু হওয়া জাদুঘর, পোশাক, সরঞ্জাম ও মডেলের মাধ্যমে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
চট্টগ্রাম যে জন্য বিখ্যাত
চট্টগ্রাম কীভাবে যাবেন
ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের যোগাযোগ খুব ভালো। ঢাকা থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানে এক ঘণ্টারও কম সময় লাগে। কমলাপুর থেকে আন্তঃনগর ট্রেনে চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছাতে মোটামুটি পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা, আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাসে যানজটভেদে প্রায় পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা; বাস থামে দামপাড়া, গরীবুল্লাহ শাহ, অক্সিজেনের মতো টার্মিনালে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির বাস ছাড়ে।
হাট ও বাজার
- খাতুনগঞ্জ ও আসাদগঞ্জ
- চাক্তাই খালের পাশের ঐতিহাসিক পাইকারি গলি, মসলা, চিনি, তেল, ডাল ও শুঁটকির জাতীয় বাণিজ্যকেন্দ্র। নানা জাতের শুঁটকির বস্তা দেখতে হলে আসাদগঞ্জই সেরা জায়গা।
- রেয়াজউদ্দিন বাজার
- রেলস্টেশনের কাছের বিশাল, ভিড়ভাট্টার বাজার, যেখানে ইলেকট্রনিকস, কাপড় থেকে রান্নাঘরের জিনিস ও খাবার পর্যন্ত প্রায় সবই মেলে।
- টেরিবাজার
- কাপড়, শাড়ি, বিয়ের পোশাক আর দর্জির কাজের জন্য শহরের সবচেয়ে পরিচিত বাজার; ঈদ ও বিয়ের মৌসুমের আগে সবচেয়ে ব্যস্ত।
এক নজরে চট্টগ্রাম
মিডমার্টে চট্টগ্রাম-এর দোকান
চট্টগ্রাম থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
চট্টগ্রাম-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনচট্টগ্রাম নিয়ে প্রশ্ন
চট্টগ্রাম-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
চট্টগ্রাম থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনচট্টগ্রাম বিভাগের আরও জেলা
- বান্দরবান মেঘে ঢাকা পাহাড়, সাঙ্গু নদী আর দেশের সবচেয়ে উঁচু চূড়াগুলোর জেলা
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া তিতাস নদী, উচ্চাঙ্গসংগীত, ছানামুখী আর পূর্বাঞ্চলের গ্যাসক্ষেত্রের জেলা
- চাঁদপুর পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মিলনস্থলে ইলিশের বাড়ি
- কুমিল্লা ময়নামতির বৌদ্ধ নিদর্শন, খাদি কাপড় আর সবার চেনা রসমালাই
- কক্সবাজার অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত, মেরিন ড্রাইভ, শুঁটকি আর লবণের মাঠ
- ফেনী ঢাকা-চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার, খন্ডলের মিষ্টির দেশ
- খাগড়াছড়ি চেঙ্গী নদীর তীরে সবুজ পাহাড়, আলুটিলা গুহা আর সাজেকের পথ
- লক্ষ্মীপুর মেঘনার মোহনায় সয়াবিনের খেত, নারকেল আর সুপারির বাগান
- নোয়াখালী মেঘনার বুকে জেগে ওঠা নতুন ভূমি: হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ আর বিখ্যাত উপভাষা
- রাঙ্গামাটি কাপ্তাই হ্রদ, ঝুলন্ত সেতু আর সাজেক: পাহাড়ের হ্রদের জেলা
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Chittagong District
- BBS Population and Housing Census 2022 — District Report: Chattogram
- Wikipedia — Chittagong District
- চট্টগ্রাম বন্দর — ছবি: Motiur Rahman Oni · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- গুলিয়াখালী সৈকত, সীতাকুণ্ড — ছবি: Syed Sajidul Islam · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা