রাঙ্গামাটি সম্পর্কে
আয়তনে রাঙ্গামাটি বাংলাদেশের বৃহত্তম জেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার মাঝেরটি। এর সীমানায় ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য এবং মিয়ানমারের চিন রাজ্য, ফলে এটিই একমাত্র জেলা যা দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেই সীমান্তযুক্ত; পশ্চিমে খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম, দক্ষিণে বান্দরবান। জেলায় ১০টি উপজেলা: রাঙ্গামাটি সদর, কাপ্তাই, কাউখালী, বাঘাইছড়ি, বরকল, লংগদু, রাজস্থলী, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি ও নানিয়ারচর।
জেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য কাপ্তাই হ্রদ, ষাটের দশকের শুরুতে কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দেওয়ার ফলে তৈরি বিশাল জলাধার। বনঘেরা পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে হ্রদটি বহু কিলোমিটার এঁকেবেঁকে গেছে, আর জেলার অনেক এলাকায় সড়কের বদলে নৌপথেই যেতে হয়। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৪৮ হাজার। অর্ধেকের কিছু বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, সবচেয়ে বেশি চাকমা, সঙ্গে মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, খিয়াং, পাংখোয়াসহ অন্যরা; বাকিদের বেশির ভাগ বাঙালি। আঞ্চলিক পরিষদ ও চাকমা রাজার আসন হওয়ায় রাঙ্গামাটি শহরকে প্রায়ই পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজধানী বলা হয়।
ইতিহাস
আঠারো শতকে মোগল ও পরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব বিস্তারের আগে অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ত্রিপুরা ও আরাকানের রাজাদের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র ছিল। চাকমা প্রধানেরা এখানে প্রধান শক্তি হয়ে ওঠেন; রাঙ্গামাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন ঐতিহ্যবাহী সার্কেলের মধ্যে বৃহত্তম চাকমা সার্কেলের কেন্দ্র, যার প্রধান চাকমা রাজা এখনো ভূমি ও প্রথাগত বিষয়ে ভূমিকা রাখেন। ব্রিটিশরা ১৮৬০ সালে রাঙ্গামাটিকে সদর দপ্তর করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা জেলা করে, আর ১৯৮৩ সালে রাঙ্গামাটি নিজেই জেলা হয়।
ষাটের দশকের শুরুতে সম্পন্ন কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ বাঁধ জেলার চেহারা বদলে দেয়। ক্রমশ বাড়তে থাকা পানিতে সবচেয়ে উর্বর আবাদি জমির বড় অংশ, পুরোনো চাকমা রাজপ্রাসাদ আর বহু গ্রাম তলিয়ে যায়, বাস্তুচ্যুত হন হাজার হাজার মানুষ, যাঁদের বেশির ভাগ চাকমা; পাহাড়ে সেই ক্ষতির স্মৃতি আজও জাগ্রত। এরপর কয়েক দশকের সংঘাতের অবসান ঘটে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিতে। ১৯৭১ সালে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ নানিয়ারচরের বুড়িঘাটে প্রতিরক্ষা অবস্থান আগলে রাখতে গিয়ে শহীদ হন, হ্রদের পাড়ে সেখানেই তাঁর সমাধি।
অর্থনীতি ও জীবিকা
বেশির ভাগ পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল: পাহাড়ের ঢালে জুম চাষ আর উপত্যকায় আনারস, কলা, কাঁঠাল, আম ও লেবুজাতীয় ফলের বাগান; নানিয়ারচরসহ হ্রদের পাড়ের এলাকা থেকে নৌকাভর্তি ফল আসে রাঙ্গামাটি শহরে। কাপ্তাই হ্রদে বড় মৎস্যক্ষেত্র, কাচকি ও চাপিলার মতো ছোট মাছ শুঁটকিও করা হয়। কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেয়, আর চন্দ্রঘোনার কর্ণফুলী পেপার মিল দীর্ঘদিন দেশের অন্যতম পরিচিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান। তাঁত, বাঁশ ও বেতের কাজ এবং বিশেষ করে সাজেক ও হ্রদকে ঘিরে দ্রুত বাড়তে থাকা পর্যটন বাড়তি আয়ের পথ।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
এপ্রিলের মাঝামাঝি পাহাড়ের নববর্ষ: চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই আর ত্রিপুরাদের বৈসু; হ্রদ ও নদীতে ফুল ভাসানো হয়, ঘরে ঘরে রান্না হয় নানা পদ, আর রাস্তাজুড়ে চলে পানি খেলা ও নানা খেলাধুলা। চাকমা ও মারমা জীবনে বৌদ্ধধর্ম কেন্দ্রীয়: শ্রদ্ধেয় ভিক্ষু সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভান্তে)-এর স্মৃতিবিজড়িত রাঙ্গামাটি শহরের রাজবন বিহারে কঠিন চীবর দান উৎসবে হাজারো মানুষের সমাগম হয়, যেখানে এক দিনের মধ্যে সুতা কেটে, কাপড় বুনে চীবর দান করা হয়।
দর্শনার্থীরা সবচেয়ে বেশি যে কারুপণ্য নিয়ে যান তা হলো তাঁতবস্ত্র। চাকমা তাঁতিরা নারীদের পিনন ও হাদির পাশাপাশি জ্যামিতিক নকশার চাদর, বিছানার চাদর ও ব্যাগ বোনেন; শহরের উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের জাদুঘর জেলার জনগোষ্ঠীগুলোর পোশাক, সরঞ্জাম ও অলংকারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বাঁশ কোড়ল, হ্রদের মাছ আর বাঁশের চোঙায় ধীরে রান্না করা পদ এখানকার রান্নাঘরের চেনা স্বাদ।
রাঙ্গামাটি-এর দর্শনীয় স্থান
-
কাপ্তাই হ্রদ
জেলার প্রাণকেন্দ্রের বিশাল জলাধার। শহরের ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে পুরো দিন পানিতে কাটান, দ্বীপের রেস্তোরাঁ, গ্রাম আর দর্শনীয় জায়গা ঘুরে আসুন।
-
ঝুলন্ত সেতু, রাঙ্গামাটি
হ্রদের একটি শাখার ওপর প্রায় ৩৩৫ ফুট লম্বা উজ্জ্বল লাল ঝুলন্ত পায়ে চলার সেতু, রাঙ্গামাটি শহরের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক। বর্ষায় পানি খুব বেড়ে গেলে এর অংশবিশেষ ডুবে যেতে পারে।
-
শুভলং ঝরনা, বরকল
হ্রদে এসে পড়া উঁচু ঝরনা, রাঙ্গামাটি শহর থেকে নৌকায় ঘণ্টাখানেক থেকে দুই ঘণ্টার পথ; বর্ষায় ও বর্ষার ঠিক পরে সবচেয়ে সুন্দর।
-
রাজবন বিহার ও চাকমা রাজবাড়ি
রাঙ্গামাটি শহরে হ্রদের পাড়ে কাছাকাছি বড় বৌদ্ধ বিহার ও চাকমা রাজার বাসভবন, সড়কপথে বা অল্প নৌপথে যাওয়া যায়। শালীন পোশাক পরুন এবং বিহারের নিয়ম মেনে চলুন।
-
সাজেক ভ্যালি, বাঘাইছড়ি
মিজোরাম সীমান্তের কাছে পাহাড়চূড়ার জনপদ, ভোরের মেঘের সমুদ্র আর কংলাক পাহাড়ের দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত। রাঙ্গামাটি জেলায় হলেও সড়কপথে যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে।
-
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের সমাধি, নানিয়ারচর
বুড়িঘাটে হ্রদের পাড়ে ১৯৭১ সালের এই বীরের সমাধি, রাঙ্গামাটি থেকে নৌকায় যাওয়া যায়।
রাঙ্গামাটি যে জন্য বিখ্যাত
রাঙ্গামাটি কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটি শহরে সরাসরি বাস চলে, বেশির ভাগই রাতের, সময় লাগে মোটামুটি সাত থেকে আট ঘণ্টা। চট্টগ্রামের অক্সিজেন ও বহদ্দারহাট এলাকা থেকে বাসে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। বিমানবন্দর বা রেলপথ নেই; কাছের বিমানবন্দর চট্টগ্রামে। জেলার ভেতরে কাপ্তাই হ্রদের নৌকাই প্রধান বাহন, আর সাজেকে যেতে হয় সড়কপথে খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালা হয়ে। বাংলাদেশি পর্যটকেরা সাধারণত প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলোতে অবাধে যেতে পারেন, তবে বিদেশি নাগরিকদের জেলা প্রশাসনের অনুমতি লাগে, আর সাজেকের পথে বাঘাইহাট থেকে সেনা এসকর্টে গাড়িবহর চলার নিয়ম রয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ম বদলায়, তাই যাওয়ার আগে জেনে নিন।
হাট ও বাজার
- বনরূপা বাজার
- রাঙ্গামাটি শহরের প্রধান বাজার, প্রতিদিন খোলা; তবে শনি ও বুধবারের হাটে হ্রদের চারপাশ থেকে নৌকায় আসে পাহাড়ি পণ্য, ফল, মাছ আর হাতে বোনা কাপড়।
- তবলছড়ি ও রিজার্ভ বাজার
- রাঙ্গামাটি শহরের হ্রদতীরের ব্যস্ত বাজার এলাকা, তাঁতবস্ত্র, মাছ ও নিত্যপণ্যের দোকান আর হ্রদের নৌযানের ঘাট।
এক নজরে রাঙ্গামাটি
মিডমার্টে রাঙ্গামাটি-এর দোকান
রাঙ্গামাটি থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
রাঙ্গামাটি-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনরাঙ্গামাটি নিয়ে প্রশ্ন
রাঙ্গামাটি-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
রাঙ্গামাটি থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনচট্টগ্রাম বিভাগের আরও জেলা
- বান্দরবান মেঘে ঢাকা পাহাড়, সাঙ্গু নদী আর দেশের সবচেয়ে উঁচু চূড়াগুলোর জেলা
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া তিতাস নদী, উচ্চাঙ্গসংগীত, ছানামুখী আর পূর্বাঞ্চলের গ্যাসক্ষেত্রের জেলা
- চাঁদপুর পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মিলনস্থলে ইলিশের বাড়ি
- চট্টগ্রাম বন্দর, সবুজ পাহাড় আর মেজবান: বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী
- কুমিল্লা ময়নামতির বৌদ্ধ নিদর্শন, খাদি কাপড় আর সবার চেনা রসমালাই
- কক্সবাজার অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত, মেরিন ড্রাইভ, শুঁটকি আর লবণের মাঠ
- ফেনী ঢাকা-চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার, খন্ডলের মিষ্টির দেশ
- খাগড়াছড়ি চেঙ্গী নদীর তীরে সবুজ পাহাড়, আলুটিলা গুহা আর সাজেকের পথ
- লক্ষ্মীপুর মেঘনার মোহনায় সয়াবিনের খেত, নারকেল আর সুপারির বাগান
- নোয়াখালী মেঘনার বুকে জেগে ওঠা নতুন ভূমি: হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ আর বিখ্যাত উপভাষা
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Rangamati District
- BBS Population and Housing Census 2022 — District Report: Rangamati
- Wikipedia — Rangamati District
- Dhaka Tribune — Permission first for foreigners to visit hilly districts
- কাপ্তাই হ্রদ — ছবি: ANKAN · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- সাজেক ভ্যালি, রাঙ্গামাটি — ছবি: Masum-al-Hasan Rocky · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা