গাজীপুর সম্পর্কে
ঢাকা শহর যেখানে টঙ্গীতে শেষ, গাজীপুর সেখান থেকে শুরু হয়ে উত্তরে পুরোনো ভাওয়াল পরগনা পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। জেলায় একটি সিটি করপোরেশন, গাজীপুর, আর ৫টি উপজেলা: গাজীপুর সদর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও শ্রীপুর। ২০২২ সালের জনশুমারিতে প্রায় ৫২ লাখ ৬৩ হাজার মানুষ নিয়ে এটি এখন দেশের অন্যতম জনবহুল জেলা, আর এখানকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ শহরে থাকেন।
জেলাটি মধুপুর গড়ের অংশ, একটু উঁচু লাল-বাদামি মাটির ভূমি, মাঝে মাঝে বাইদ নামের অগভীর নিচু উপত্যকা। এই উঁচু জমিতেই টিকে আছে ভাওয়ালের শালবন আর অসংখ্য কাঁঠালগাছ, আর চারপাশের নিচু জমির পানি নামে তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, বানার ও বংশী নদী দিয়ে। শীতলক্ষ্যার তীরের কাপাসিয়া এখনো মূলত সবুজ কৃষিজমি; অন্যদিকে টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর আর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই পাশ কারখানায় ভরা।
গাজীপুর শিক্ষা ও গবেষণারও কেন্দ্র: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ডুয়েট, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এখানেই।
ইতিহাস
এ অঞ্চলের ইতিহাস পুরোনো। বাংলাপিডিয়ায় টোক ও একডালার প্রাচীন দুর্গ, পাল আমলের সঙ্গে যুক্ত ঢোলসমুদ্রের ধ্বংসাবশেষ আর শ্রীপুরে স্থানীয় রাজাদের রাজধানীর ভগ্নাবশেষের কথা আছে। মোগলদের বিরুদ্ধে লড়াই করা বারো ভূঁইয়ার প্রধান ঈসা খাঁ বখতারপুরে সমাহিত, আর মোগল সুবাদার মীর জুমলার তৈরি টঙ্গীর সেতু আজও আছে। ব্রিটিশ আমলে রানীগঞ্জ ও বরমীতে নীলকুঠি চলত, আর জয়দেবপুরকেন্দ্রিক ভাওয়াল রাজ হয়ে ওঠে পূর্ববঙ্গের অন্যতম বড় জমিদারি। এর সবচেয়ে বিখ্যাত কাহিনি ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা, যেখানে কয়েক দশক ধরে আদালতে লড়াই চলে এক সন্ন্যাসী আসলে ১৯০৯ সালে মৃত বলে ধরে নেওয়া রাজকুমার কি না, তা নিয়ে।
১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করতে আসা পাকিস্তানি সেনাদের রুখে দাঁড়ায় সাধারণ মানুষ; একে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ বলা হয়, আর এর স্মরণে নির্মিত হয়েছে জাগ্রত চৌরঙ্গী ভাস্কর্য। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাড়ি কাপাসিয়ায়। গাজীপুর জেলা হয় ১৯৮৪ সালে, আর গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠিত হয় ২০১৩ সালে।
অর্থনীতি ও জীবিকা
গাজীপুর দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প জেলাগুলোর একটি। টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, কালিয়াকৈর আর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কজুড়ে শত শত পোশাক, নিটওয়্যার, বস্ত্র, ওষুধ ও ইলেকট্রনিকস কারখানা, আর কালিয়াকৈরে আছে সরকারি হাই-টেক সিটি। কারখানার বাইরে জেলাটি কাঁঠালের জন্য বিখ্যাত, বিশেষ করে শ্রীপুর, কাপাসিয়া ও কালিয়াকৈরের কাঁঠাল; পাশাপাশি ধান, সবজি, আনারস, পেঁপে ও লিচু চাষ হয়। দুগ্ধ ও পোলট্রি খামারগুলো প্রতিদিন ঢাকায় দুধ, ডিম ও মাংস সরবরাহ করে।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
প্রতি শীতে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমায় লাখো মুসল্লি জড়ো হন, যা পৃথিবীর অন্যতম বড় ধর্মীয় সমাবেশ। কালীগঞ্জের নাগরী ও মঠবাড়ীতে ভাওয়ালের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বাস, যাঁদের গির্জাগুলো কয়েক শতাব্দী পুরোনো, আর বনাঞ্চলের গ্রামগুলোতে এখনো রাজবংশী ও কোচ পরিবার থাকে।
মে মাসের শেষ থেকে জুলাই পর্যন্ত কাঁঠালের মৌসুম এখানকার সবচেয়ে বড় উৎসবের সময়; কাঁচা কাঁঠাল তরকারি হিসেবে রান্না হয়, আর বিচি ভাজা বা ভুনা খাওয়া হয়। লেখক ও চলচ্চিত্রকারদের কাছেও এই জেলা প্রিয়; কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ শালবনের মাঝে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর নুহাশ পল্লী।
গাজীপুর-এর দর্শনীয় স্থান
-
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান
রাজেন্দ্রপুরের কাছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে বিশাল সংরক্ষিত শালবন, যেখানে হাঁটার পথ, পিকনিক স্পট ও লেক আছে। ঢাকার কাছে দেশীয় পত্রঝরা বন আর তার পাখি দেখার সবচেয়ে সহজ জায়গা।
-
গাজীপুর সাফারি পার্ক
শ্রীপুরের এই খোলা সাফারি পার্কে গাড়িতে চড়ে বাঘ, সিংহ, ভালুক ও হরিণের বেষ্টনী ঘুরে দেখা যায়; আছে পাখিশালা আর চিড়িয়াখানার মতো একটি মূল অংশও। প্রায় পুরো দিন হাতে রাখুন।
-
ভাওয়াল রাজবাড়ি
জয়দেবপুরে ভাওয়াল জমিদারদের উনিশ শতকের প্রাসাদ, লম্বা স্তম্ভশোভিত ভবনটিতে এখন সরকারি দপ্তর। বিখ্যাত ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার কাহিনি এই বাড়িকে ঘিরেই।
-
নুহাশ পল্লী
পিরুজালীতে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাগানবাড়ি, যেখানে পুকুর, ভাস্কর্য আর নানা জাতের গাছের বড় সংগ্রহ। লেখক এখানেই সমাহিত, আর সারা বছরই ভক্তরা আসেন।
-
জাগ্রত চৌরঙ্গী
জয়দেবপুর চৌরাস্তায় এক মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্মারক ভাস্কর্য হিসেবে পরিচিত, যা ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চের প্রতিরোধের স্মরণে নিবেদিত।
গাজীপুর যে জন্য বিখ্যাত
গাজীপুর কীভাবে যাবেন
টঙ্গী হয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক গাজীপুরকে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করেছে; জয়দেবপুর ঢাকার কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার, যানজট বুঝে বাস বা গাড়িতে এক থেকে দুই ঘণ্টা লাগে। মহাখালী আর বিমানবন্দর সড়কের বিভিন্ন স্টপেজ থেকে বাস ছাড়ে, আর বিআরটি করিডোরও গাজীপুর রুটে চলে। উত্তরের প্রায় সব ট্রেন জয়দেবপুর জংশনে থামে, যা ব্যস্ত সময়ে সড়কের চেয়ে প্রায়ই দ্রুত। কালিয়াকৈর পড়ে টাঙ্গাইল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পথে।
হাট ও বাজার
- জৈনা বাজার, শ্রীপুর
- ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের এই বাজারকে দেশের সবচেয়ে বড় কাঁঠালের হাট বলা হয়। মৌসুমে ব্যাপারীরা ট্রাক বোঝাই করে সারা দেশের ক্রেতাদের জন্য কাঁঠাল পাঠান।
- আমরাইদ বাজার, কাপাসিয়া
- ঢাকা-কিশোরগঞ্জ সড়কের পাশে বড় সাপ্তাহিক হাট, গাজীপুরের সবচেয়ে বড় পশুর হাট হিসেবে পরিচিত, বিশেষ করে ঈদুল আজহার আগের সপ্তাহগুলোতে।
- টঙ্গী বাজার
- তুরাগ তীরের পুরোনো বাজার, মীর জুমলার সেতুর কাছে; শিল্পাঞ্চলের মানুষের জন্য মাছ, সবজি আর গৃহস্থালি পণ্যের পাইকারি কেনাবেচা চলে।
এক নজরে গাজীপুর
মিডমার্টে গাজীপুর-এর দোকান
গাজীপুর থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
গাজীপুর-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনগাজীপুর নিয়ে প্রশ্ন
গাজীপুর-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
গাজীপুর থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনঢাকা বিভাগের আরও জেলা
- ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরের রাজধানী: মোগল দুর্গ, মসলিনের স্মৃতি আর কখনো না থামা এক শহর
- ফরিদপুর পদ্মাপাড়ের সোনালি আঁশের দেশ, পল্লীকবির জন্মভূমি
- গোপালগঞ্জ মধুমতী তীরের বিলের দেশ: ভাসমান বাগান আর টুঙ্গিপাড়া
- কিশোরগঞ্জ হাওরের প্রবেশদ্বার, শোলাকিয়া আর কবি চন্দ্রাবতীর জেলা
- মাদারীপুর আড়িয়াল খাঁ তীরের শহর: খেজুরের গুড়, শাহ মাদার আর শকুনি লেক
- মানিকগঞ্জ যেখানে যমুনা মেশে পদ্মায়: জমিদারবাড়ি আর হাজারী গুড়
- মুন্সিগঞ্জ প্রাচীন বিক্রমপুর: আলু, পাতক্ষীর আর পদ্মা সেতুর উত্তর প্রান্ত
- নারায়ণগঞ্জ প্রাচীন সোনারগাঁও, জামদানির তাঁত আর শীতলক্ষ্যার নিটওয়্যার বন্দর
- নরসিংদী মাধবদীর তাঁত, লটকনের বাগান আর প্রাচীন উয়ারী-বটেশ্বর
- রাজবাড়ী গোয়ালন্দ আর দৌলতদিয়া: পেঁয়াজ-পাটের দেশে পদ্মার প্রবেশদ্বার
- শরীয়তপুর পদ্মা-মেঘনার মিলনে জাজিরা, কীর্তিনাশা আর বিবিখানা পিঠা
- টাঙ্গাইল টাঙ্গাইল শাড়ি, পোড়াবাড়ির চমচম আর মধুপুরের শালবন
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Gazipur District
- BBS Population and Housing Census 2022, National Report Vol. 1 (final enumerated figures, Nov 2023)
- Wikipedia — Gazipur District
- Gazipur district portal — haats and bazaars
- শালবন, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান — ছবি: Salim Khandoker · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- গাছে কাঁঠাল, গাজীপুর — ছবি: Mazhar Zarif · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা