মুন্সিগঞ্জ সম্পর্কে
মুন্সিগঞ্জ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের ঠিক দক্ষিণে, যেখানে দক্ষিণ-পশ্চিমে পদ্মা, পূর্বে মেঘনা আর উত্তরে ধলেশ্বরী মিলে একটি কোণ তৈরি করেছে। জেলার ৬টি উপজেলা: মুন্সিগঞ্জ সদর, শ্রীনগর, সিরাজদিখান, লৌহজং, টংগিবাড়ী ও গজারিয়া। ২০২২ সালের জনশুমারিতে এক হাজার বর্গকিলোমিটারের কম এলাকায় প্রায় ১৬ লাখ ২৫ হাজার মানুষ, ফলে এটি দেশের ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামীণ জেলাগুলোর একটি।
জেলার বড় অংশ প্রাচীন বিক্রমপুর অঞ্চল, খালে খালে ভরা উর্বর নিচু জমি আর পুরোনো দিঘিতে ছাওয়া। লৌহজংয়ের মাওয়া পদ্মা বহুমুখী সেতুর উত্তর প্রান্ত, আর ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ও নতুন রেলপথ এখন শ্রীনগর ও লৌহজং দিয়েই চলে গেছে। মেঘনার ওপারের গজারিয়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে দ্রুত বেড়ে ওঠা শিল্প এলাকা।
শীতে মাঠগুলো আলুগাছে সবুজ হয়ে যায়, আর মুন্সিগঞ্জকে প্রায়ই বাংলাদেশের আলুর রাজধানী বলা হয়; রাস্তার পাশে সারি সারি হিমাগার তারই প্রমাণ।
ইতিহাস
বিক্রমপুর ছিল প্রাচীন বাংলার অন্যতম বড় কেন্দ্র। মোটামুটি দশম থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত এটি চন্দ্র, বর্মণ ও সেন রাজাদের রাজধানী ছিল, আর দশম শতকে বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্ম নেন বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, যিনি পরে তিব্বতে শিক্ষা দেন। রঘুরামপুর ও নাটেশ্বরের খননে সেই যুগের বৌদ্ধ বিহারের নিদর্শন পাওয়া গেছে। রামপালের বল্লাল সেন ও হরিশচন্দ্রের দিঘি সেন আমলের কথা মনে করিয়ে দেয়, আর সেখানকার বাবা আদমের মসজিদ নির্মিত হয় ১৪৮৩ সালে।
১৬৬০ সালে মোগল সুবাদার মীর জুমলা মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাত থেকে নদীপথ রক্ষায় ইদ্রাকপুর দুর্গ নির্মাণ করেন। ব্রিটিশ আমলে মুন্সিগঞ্জ ছিল ঢাকার একটি মহকুমা; ১৯৮৪ সালে এটি জেলা হয়। বিক্রমপুর বাংলাকে অনেক পণ্ডিত ও নেতা দিয়েছে, যেমন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, যাঁর পৈতৃক বাড়ি রাঢ়িখালে, লেখক বুদ্ধদেব বসু আর সাঁতারু ব্রজেন দাস।
অর্থনীতি ও জীবিকা
কৃষি অর্থনীতির কেন্দ্রে আলু, যাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল হিমাগার নেটওয়ার্ক; এর বাইরে ধান, সরিষা, সবজি ও কলা চাষ হয়। ধলেশ্বরীর তীরের মিরকাদিম চালকল আর ঈদুল আজহার জন্য পালিত সাদা গরুর জন্য পরিচিত। পদ্মা ও মেঘনায় মাছ ধরা, বিশেষ করে ইলিশ, বড় জীবিকা, আর মাওয়ার মাছ-ভাজার রেস্তোরাঁ ভ্রমণকারীদের কাছে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। গজারিয়ায় মেঘনার তীরে সিমেন্ট, ইস্পাত ও জাহাজ নির্মাণ কারখানা, আর বহু পরিবারের কাছে প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
বিক্রমপুরের মিষ্টি বিখ্যাত: সিরাজদিখান ও টংগিবাড়ীর ঘন দুধের পাতক্ষীর আর শ্রীনগরের ভাগ্যকুলের মিষ্টি। মাওয়া ঘাটে ডিমসহ ইলিশ ভাজা আর বেগুন ভাজা খাওয়া ভ্রমণের প্রায় অবশ্যকর্তব্য। মিরকাদিম থেকে মুন্সিগঞ্জ পর্যন্ত ধলেশ্বরীতে নৌকাবাইচ দেখতে হাজারো মানুষ জড়ো হন, আর শ্যামসিদ্ধির মেলা ও রথযাত্রার মতো আয়োজন পুরোনো ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছে।
জেলার সাহিত্য ও সংগীতের ঐতিহ্যও সমৃদ্ধ; উৎসবে যাত্রা, পালাগান, কবিগান আর কীর্তন হয়।
মুন্সিগঞ্জ-এর দর্শনীয় স্থান
-
ইদ্রাকপুর দুর্গ
মুন্সিগঞ্জ শহরে আনুমানিক ১৬৬০ সালে নির্মিত মোগল নদীদুর্গ, উঁচু গোলাকার কামান-মঞ্চ আর খাঁজকাটা প্রাচীরসহ। বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালোভাবে টিকে থাকা মোগল জলদুর্গগুলোর একটি।
-
বাবা আদমের মসজিদ
রামপালে সুলতানি আমলে ১৪৮৩ সালে নির্মিত ছয় গম্বুজের ইটের মসজিদ, পাশে সাধক বাবা আদমের মাজার। এর টেরাকোটার কাজ আর মজবুত গড়ন এলাকার অন্যতম আকর্ষণ।
-
অতীশ দীপঙ্করের জন্মভিটা, বজ্রযোগিনী
বৌদ্ধ গুরু অতীশ দীপঙ্করের প্রথাগত জন্মস্থান, যেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ আছে। কাছের রঘুরামপুর ও নাটেশ্বরের খননে বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।
-
জগদীশচন্দ্র বসু স্মৃতি কমপ্লেক্স, রাঢ়িখাল
শ্রীনগরে বিজ্ঞানীর পৈতৃক বাড়ি, এখন জাদুঘর, বাগান আর পুকুরসহ স্মৃতি কমপ্লেক্স।
-
মাওয়া ও পদ্মা সেতু
মাওয়ার নদীতীর থেকে পদ্মা সেতুর দৃশ্য দেখা যায়, আর পুরোনো ফেরিঘাটের পাশে আছে বিখ্যাত ইলিশ-ভাজার রেস্তোরাঁ।
মুন্সিগঞ্জ যে জন্য বিখ্যাত
মুন্সিগঞ্জ কীভাবে যাবেন
যানজট কম থাকলে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ঢাকার কেন্দ্র থেকে এক ঘণ্টার কম সময়ে মাওয়া ও শ্রীনগরে পৌঁছানো যায়, আর পদ্মা সেতুর রেলপথে ট্রেন মাওয়ায় থামে। মুন্সিগঞ্জ শহরে যেতে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ধলেশ্বরীর ওপর মুক্তারপুর সেতু পার হতে হয়; গুলিস্তান থেকে বাসে মোটামুটি দেড় ঘণ্টা, অথবা সদরঘাট থেকে লঞ্চে। গজারিয়া মেঘনা সেতুর ওপারে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে।
হাট ও বাজার
- মিরকাদিম হাট
- ধলেশ্বরীর তীরের ঐতিহাসিক নদীবন্দর বাজার, চালের ব্যবসা আর ঈদুল আজহার আগে বিখ্যাত সাদা গরুর জন্য পরিচিত।
- মাওয়া মাছঘাট
- মাওয়ার মাছের আড়ত ও বাজার, যেখানে পদ্মার ইলিশসহ নানা মাছ নিলামে ওঠে আর তাজা বিক্রি হয়।
- মুন্সিগঞ্জ শহরের বাজার
- জেলা শহরের কেন্দ্রীয় বাজার, মৌসুমে আলু ও সবজি আর বিক্রমপুরের মিষ্টির জন্য ভালো।
এক নজরে মুন্সিগঞ্জ
মিডমার্টে মুন্সিগঞ্জ-এর দোকান
মুন্সিগঞ্জ থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
মুন্সিগঞ্জ-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনমুন্সিগঞ্জ নিয়ে প্রশ্ন
মুন্সিগঞ্জ-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
মুন্সিগঞ্জ থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনঢাকা বিভাগের আরও জেলা
- ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরের রাজধানী: মোগল দুর্গ, মসলিনের স্মৃতি আর কখনো না থামা এক শহর
- ফরিদপুর পদ্মাপাড়ের সোনালি আঁশের দেশ, পল্লীকবির জন্মভূমি
- গাজীপুর ঢাকার উত্তরে শালবন, কাঁঠালবাগান আর কারখানার জেলা
- গোপালগঞ্জ মধুমতী তীরের বিলের দেশ: ভাসমান বাগান আর টুঙ্গিপাড়া
- কিশোরগঞ্জ হাওরের প্রবেশদ্বার, শোলাকিয়া আর কবি চন্দ্রাবতীর জেলা
- মাদারীপুর আড়িয়াল খাঁ তীরের শহর: খেজুরের গুড়, শাহ মাদার আর শকুনি লেক
- মানিকগঞ্জ যেখানে যমুনা মেশে পদ্মায়: জমিদারবাড়ি আর হাজারী গুড়
- নারায়ণগঞ্জ প্রাচীন সোনারগাঁও, জামদানির তাঁত আর শীতলক্ষ্যার নিটওয়্যার বন্দর
- নরসিংদী মাধবদীর তাঁত, লটকনের বাগান আর প্রাচীন উয়ারী-বটেশ্বর
- রাজবাড়ী গোয়ালন্দ আর দৌলতদিয়া: পেঁয়াজ-পাটের দেশে পদ্মার প্রবেশদ্বার
- শরীয়তপুর পদ্মা-মেঘনার মিলনে জাজিরা, কীর্তিনাশা আর বিবিখানা পিঠা
- টাঙ্গাইল টাঙ্গাইল শাড়ি, পোড়াবাড়ির চমচম আর মধুপুরের শালবন
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Munshiganj District
- BBS Population and Housing Census 2022, National Report Vol. 1 (final enumerated figures, Nov 2023)
- Wikipedia — Munshiganj District
- ইদ্রাকপুর দুর্গ, মুন্সিগঞ্জ — ছবি: Rayhan9d · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- বাবা আদমের মসজিদ, রামপাল — ছবি: Md Saiful Islam Khan (Aopu) · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা