খুলনা সম্পর্কে
খুলনা জেলা উত্তরে যশোরের উপকণ্ঠ থেকে দক্ষিণে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। উত্তরে যশোর ও নড়াইল, পূর্বে বাগেরহাট, পশ্চিমে সাতক্ষীরা। রূপসা, ভৈরব, পশুর, শিবসা, কপোতাক্ষ ও আড়পাঙ্গাশিয়া নদী দিয়ে জোয়ারের পানি জেলার ভেতরে ঢোকে; দক্ষিণের দাকোপ ও কয়রা উপজেলা মূলত বাঁধঘেরা কৃষিজমির দ্বীপ, যার সামনেই ম্যানগ্রোভ বন।
রূপসা ও ভৈরবের পশ্চিম তীরে খুলনা শহর বিভাগীয় সদর এবং দেশের বড় শহরগুলোর একটি। নদীবন্দর ও শিল্পনগরী হিসেবে এর বিকাশ — পাটকল, জাহাজ নির্মাণ কারখানা আর খালিশপুরের নিউজপ্রিন্ট মিল। আজ এখানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও অঞ্চলের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কুয়েট রয়েছে।
জেলার দক্ষিণাঞ্চলের জীবন লোনা পানির সঙ্গে বাঁধা। পাইকগাছা, দাকোপ ও কয়রার বড় অংশজুড়ে চিংড়ি ও কাঁকড়ার ঘের। ২০০৭ সালের সিডর ও ২০০৯ সালের আইলার মতো ঘূর্ণিঝড় বারবার উপকূলে আঘাত হেনেছে, রেখে গেছে লবণাক্ততা আর ভাঙা বাঁধের দীর্ঘ ক্ষত।
ইতিহাস
প্রচলিত একটি কাহিনিতে নামটিকে দেবী খুল্লনেশ্বরীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যাঁর মন্দির মধ্যযুগের সওদাগর ধনপতি ও তাঁর স্ত্রী খুল্লনার আখ্যানের সঙ্গে জড়িত। পনেরো শতকে খান জাহান আলীর অনুসারীরা এ অঞ্চলের কিছু অংশে বসতি গড়েন। ব্রিটিশ আমলে ১৮৪২ সালে খুলনাকে যশোরের মহকুমা করা হয়, যাকে প্রায়ই বাংলার প্রথম মহকুমা বলা হয়; ১৮৮২ সালে এটি আলাদা জেলা হয়। রসায়নবিদ ও শিক্ষাবিদ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় পাইকগাছার রাড়ুলীতে জন্মগ্রহণ করেন, আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৈতৃক গ্রাম পিঠাভোগ ও তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর বাবার বাড়ি দক্ষিণডিহি — দুটিই এই জেলায়।
১৯৪৭ সালের পর খুলনায় দ্রুত শিল্পায়ন হয়; খালিশপুর ও রূপসার তীর ভরে ওঠে পাট, কাগজ ও প্রকৌশল কারখানায়। ১৯৭১ সালে গল্লামারীতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা ঘটে, আর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি শিরোমণির যুদ্ধ ছিল শহর মুক্ত হওয়ার আগের শেষ বড় লড়াইগুলোর একটি।
অর্থনীতি ও জীবিকা
খুলনা বাংলাদেশের চিংড়িশিল্পের কেন্দ্র। দক্ষিণের লোনা পানির বাগদা আর ডুমুরিয়া ও ফুলতলার গলদা যায় রূপসার তীরের প্রক্রিয়াজাত কারখানায়, যেখান থেকে হিমায়িত সাদা মাছ, চিংড়ি ও কাঁকড়া রপ্তানি হয়। ডুমুরিয়া সবজি ও মাছ উৎপাদনেরও বড় এলাকা। ২০২০ সালে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হলেও বেসরকারি পাটকল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও খুলনা শিপইয়ার্ড চালু আছে, আর পাশের বাগেরহাটের মোংলা বন্দর বাণিজ্য ও পরিবহনকে গতি দেয়। মৌসুমি অনুমতিতে সুন্দরবন থেকে মধু, মাছ, কাঁকড়া ও গোলপাতা আহরণ করা হয়।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
খুলনার স্বাদের পরিচয় চুইঝাল — স্থানীয় এক লতানো গাছের ঝাঁঝালো কাণ্ড, যা গরু, খাসি বা মাছের সঙ্গে রান্না হয়; শহর ও মহাসড়কের পাশের অনেক খাবার হোটেল এর জন্য বিখ্যাত। চিংড়ির মালাইকারি, নদীর মাছ আর কালিজিরা চালের ভাত ঘরের প্রিয় খাবার।
উপকূলের মানুষ বনে ঢোকার আগে বনবিবির পূজা দেন, আর প্রতি শীতে খুলনার বহু মানুষ সুন্দরবনের দুবলার চরে রাসমেলায় যোগ দেন। লোকনাট্য, কীর্তন আর জেলেদের গান এখানকার জীবনের অংশ; শহরে নাটক ও সাহিত্যচর্চাও বেশ সক্রিয়।
খুলনা-এর দর্শনীয় স্থান
-
খান জাহান আলী সেতু (রূপসা সেতু)
২০০৫ সালে চালু হওয়া রূপসা নদীর ওপর দীর্ঘ সড়কসেতু, যা খুলনা শহরকে মোংলা ও বাগেরহাটের সড়কের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সেতুর নিচের নদীতীর নৌকা আর শহরের দৃশ্য দেখার জনপ্রিয় বিকেলের জায়গা।
-
দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স
ফুলতলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর বাবার বাড়ি, সংস্কার করে বাগানসহ ছোট জাদুঘর ও কবির স্মৃতিস্থান হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
-
খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর
খুলনা–যশোর সড়কের পাশের এই জাদুঘরে ভরত ভায়না, খান জাহান আলীর বাগেরহাটসহ দক্ষিণ-পশ্চিমের নানা প্রত্নস্থল থেকে পাওয়া নিদর্শন রয়েছে।
-
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বাড়ি, রাড়ুলী
পাইকগাছায় কপোতাক্ষ নদের তীরে পথিকৃৎ রসায়নবিদের জন্মভিটা, ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে সংরক্ষিত; কাছেই তাঁর নামে কলেজ।
-
দাকোপ ও কয়রা হয়ে সুন্দরবন
নলিয়ান, কালাবগি ও কয়রা থেকে নৌকায় পশ্চিম সুন্দরবনে যাওয়া যায় — জোয়ার-ভাটার খাল, চিত্রা হরিণ, ভাগ্য ভালো হলে বাঘের পায়ের ছাপও। বন বিভাগের অনুমতি লাগে, সাধারণত ট্যুর অপারেটররা ব্যবস্থা করেন।
খুলনা যে জন্য বিখ্যাত
খুলনা কীভাবে যাবেন
ঢাকার সায়েদাবাদ ও গাবতলী থেকে বাস পদ্মা সেতু পার হয়ে মোটামুটি চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায় খুলনা পৌঁছায়। পদ্মা সেতু রেল সংযোগে জাহানাবাদ এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনেও প্রায় একই সময় লাগে, আর চিত্রা এক্সপ্রেসের মতো আন্তঃনগর ট্রেন যমুনা সেতু হয়ে দীর্ঘ পথে চলে। ঢাকা থেকে নিয়মিত ফ্লাইট আসা যশোর বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে প্রায় দেড় ঘণ্টা।
হাট ও বাজার
- বড় বাজার, খুলনা
- ভৈরবের তীরে শহরের পুরোনো পাইকারি বাজার; মসলা, চাল, মাছ, হার্ডওয়্যার ও মুদি ব্যবসায়ীদের ঘিঞ্জি এলাকা, যেখান থেকে পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমে মাল যায়।
- খুলনা নিউমার্কেট
- শহরের বড় পরিকল্পিত বিপণিকেন্দ্র; পোশাক, জুতা, শাড়ি, ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি পণ্যের জন্য পরিচিত।
- রূপসা মাছঘাট
- রূপসা নদীর তীরে মাছ ও চিংড়ির পাইকারি অবতরণকেন্দ্র; নদী ও ঘেরের মাছ আসে বলে ভোরবেলা সবচেয়ে ব্যস্ত থাকে।
এক নজরে খুলনা
মিডমার্টে খুলনা-এর দোকান
খুলনা থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
খুলনা-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনখুলনা নিয়ে প্রশ্ন
খুলনা-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
খুলনা থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনখুলনা বিভাগের আরও জেলা
- বাগেরহাট সুন্দরবনের কোলে খান জাহানের মসজিদের শহর
- চুয়াডাঙ্গা খেজুরের গুড়, পান আর দর্শনা চিনিকলের সীমান্ত জেলা
- যশোর ফুলের রাজধানী, খেজুর গুড় আর বেনাপোল সীমান্তের জেলা
- ঝিনাইদহ সুলতানি মসজিদ, নলডাঙ্গার মন্দির আর কালীগঞ্জের বিশাল বটগাছ
- কুষ্টিয়া লালন ও রবীন্দ্রনাথের ভূমি, তিলের খাজা আর কুমারখালীর তাঁত
- মাগুরা রাজা সীতারামের দেশ — পাটের খেত, পেড়া সন্দেশ আর খামারপাড়ার দই
- মেহেরপুর মুজিবনগর — যেখানে শপথ নিয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার
- নড়াইল এস এম সুলতানের চিত্রা নদীর দেশ, নৌকাবাইচ আর ক্রিকেটারদের জেলা
- সাতক্ষীরা আগাম আম, সফট-শেল কাঁকড়া আর পশ্চিম সুন্দরবন
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Khulna District
- BBS Population and Housing Census 2022, National Report (Vol. 1, final)
- Wikipedia — Khulna District
- রূপসা সেতু, খুলনা — ছবি: Leonkazi007 · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- রূপসা নদীতে লঞ্চ — ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা