ঝিনাইদহ সম্পর্কে
খুলনা বিভাগের উত্তর-পশ্চিমে ঝিনাইদহ জেলা; উত্তরে কুষ্টিয়া, পূর্বে মাগুরা, দক্ষিণে যশোর এবং পশ্চিমে চুয়াডাঙ্গা ও ভারতের সীমান্ত। গড়াই, কুমার, নবগঙ্গা, চিত্রা, ভৈরব ও কপোতাক্ষ নদী উর্বর সমতল ভূমির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে, মাঝে মাঝে বিল আর পুরোনো মরা নদীর বাঁক, যাকে স্থানীয়ভাবে বাঁওড় বলা হয়।
জেলা শহরটি ঢাকা–খুলনা মহাসড়ক আর কুষ্টিয়াগামী সড়কের সংযোগস্থলে, তাই ঝিনাইদহ বহুদিন ধরেই দক্ষিণ-পশ্চিমের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ছয়টি উপজেলা — ঝিনাইদহ সদর, হরিণাকুণ্ডু, কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, মহেশপুর ও শৈলকুপা — মূলত গ্রামীণ; ধান, পাট, আখ, কলা আর পানের খেত শহরের একেবারে কিনারা পর্যন্ত বিস্তৃত।
ভ্রমণকারীদের জন্য ঝিনাইদহের চমক এর ঐতিহ্য। কালীগঞ্জের বারোবাজারে খননে বেরিয়ে এসেছে বাংলার সুলতানি আমলের একগুচ্ছ ইটের মসজিদ; কাছেই নলডাঙ্গায় স্থানীয় রাজপরিবারের তৈরি কয়েকটি মন্দির, আর বেথুলীর বিশাল বটগাছ ছড়িয়ে আছে প্রায় গোটা একটি গ্রামীণ জমিজুড়ে।
ইতিহাস
নামের উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, একসময় এখানে সংগ্রহ করা মিঠা পানির ঝিনুক আর গভীর জলাশয় বা ‘দহ’ মিলে ঝিনাইদহ। ভৈরবের পুরোনো গতিপথের পাশে বারোবাজার পনেরো শতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ছিল, যা গাজী-কালু-চম্পাবতীর কিংবদন্তির সঙ্গে জড়িত; গ্রামীণ পালাগানে সে কাহিনি এখনো গাওয়া হয়। পরে নলডাঙ্গা রাজপরিবার কালীগঞ্জে তাদের রাজধানীতে মন্দির নির্মাণ করে। ১৮৬২ সালে ঝিনাইদহ যশোরের মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মহাসড়ক বরাবর বিষয়খালীসহ নানা স্থানে তীব্র লড়াই হয়। দেশের সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্ত সাতজনের একজন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের জন্ম মহেশপুরের খোর্দ খালিশপুরে। কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ি শৈলকুপায়, আর হরিণাকুণ্ডুর হরিশপুরকে মরমি সাধক লালনের জন্মস্থান হিসেবে দাবি করা হয়।
অর্থনীতি ও জীবিকা
পরিবারের আয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে কৃষি থেকে। ধান, পাট, আখ, কলা, পান, সবজি ও খেজুর গুড় প্রধান পণ্য; প্রতিবেশী যশোরের মতো কালীগঞ্জ ও মহেশপুরেও বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ হয়। কালীগঞ্জের মোবারকগঞ্জ চিনিকল স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে আখ কেনে। কোটচাঁদপুরের বলুহরের মতো বড় বাঁওড়ে মাছ চাষ হয়, আর কোটচাঁদপুর একসময় চিনির ব্যবসার জমজমাট কেন্দ্র ছিল। মহাসড়কভিত্তিক ব্যবসা, পরিবহন আর বিদেশে কর্মরত স্বজনদের পাঠানো টাকাও বহু পরিবারের ভরসা।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
কুষ্টিয়ার বাউল ঐতিহ্য ঝিনাইদহেও সমান জীবন্ত; গ্রামের মেলায় লোকগান, যাত্রা আর গাজী-কালুর পালাগান হয়। শীত মানেই গুড়ের মৌসুম — প্রতিটি গ্রামে তাজা খেজুর রস আর পিঠা, আর গ্রীষ্মে বাড়ির বাগান থেকে আম ও লিচু।
এখানে মসজিদ, মন্দির আর মাজার পাশাপাশি; নলডাঙ্গার দুর্গাপূজা আর বারোবাজারের মাজারের বার্ষিক সমাবেশে আশপাশের জেলা থেকেও মানুষ আসে।
ঝিনাইদহ-এর দর্শনীয় স্থান
-
বারোবাজারের মসজিদ-নগরী
কালীগঞ্জ উপজেলায় নব্বইয়ের দশক থেকে খনন করে পাওয়া পনেরো শতকের একগুচ্ছ ইটের মসজিদ, যার মধ্যে গলাকাটা, জোড়বাংলা ও গোড়ার মসজিদ উল্লেখযোগ্য। অনেকগুলোতে পোড়ামাটির অলংকরণ আছে, পাশে বড় পুরোনো দিঘি।
-
নলডাঙ্গা মন্দির কমপ্লেক্স
কালীগঞ্জের কাছে নলডাঙ্গা রাজপরিবারের নির্মিত মন্দিরগুচ্ছ; মাঝখানে উঁচু চূড়ার প্রধান মন্দির, চারপাশে ছোট মন্দির ও সবুজ চত্বর। এখনো এখানে পূজা হয়।
-
বেথুলীর বিশাল বটগাছ (মল্লিকপুরের বটগাছ)
একসময় এশিয়ার বৃহত্তম বটগাছ হিসেবে পরিচিত এই গাছটি কালীগঞ্জের বেথুলী গ্রামের কাছে ঝুরির মাধ্যমে কয়েক একর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। কিছু অংশ হারিয়ে গেলেও এখনো দেখার মতো।
-
শৈলকুপা শাহী মসজিদ
কুমার নদীর কাছে শৈলকুপা শহরে মোগলপূর্ব আমলের বহু গম্বুজবিশিষ্ট ইটের মসজিদ, সংস্কারের পর এখন নিয়মিত নামাজ হয়।
-
মিয়ার দালান
ঝিনাইদহ শহরের অদূরে নবগঙ্গার তীরে উনিশ শতকের এক জমিদারের ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ, খিলানযুক্ত বারান্দা আর পলেস্তারার কারুকাজ এখনো চোখে পড়ে।
ঝিনাইদহ যে জন্য বিখ্যাত
ঝিনাইদহ কীভাবে যাবেন
বেশির ভাগ যাত্রী ঢাকার গাবতলী বা সায়েদাবাদ থেকে বাসে পদ্মা সেতু পার হয়ে ফরিদপুর ও মাগুরা হয়ে আসেন; সময় লাগে মোটামুটি চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। ঝিনাইদহ শহরে রেলপথ নেই, তবে দক্ষিণের মোবারকগঞ্জ ও কোটচাঁদপুর স্টেশন যশোর–দর্শনা রেলপথের ওপর। নিকটতম বিমানবন্দর যশোর, সড়কপথে প্রায় এক ঘণ্টা।
হাট ও বাজার
- বারোবাজার
- কালীগঞ্জের মহাসড়কঘেঁষা বাজার-শহর, যার নামে পুরোনো বারোটি বাজারের স্মৃতি। এখন এখানে সবজি, কলা ও নিত্যপণ্যের বেচাকেনা হয়, আর মসজিদের ধ্বংসাবশেষ দেখতে এখান থেকেই যেতে হয়।
- কালীগঞ্জ বাজার
- ঢাকা–খুলনা মহাসড়কের পাশে কালীগঞ্জ উপজেলার বাণিজ্যকেন্দ্র; কৃষিপণ্য, আখের ব্যবসা আর পাইকারি মালামালের লেনদেন এখানে জমে ওঠে।
- কোটচাঁদপুর বাজার
- কপোতাক্ষের তীরে একসময় চিনির জন্য বিখ্যাত পুরোনো বাণিজ্য-শহর; এখন বাজারে চাল, সবজি আর আশপাশের বাঁওড়ের মাছ বিক্রি হয়।
এক নজরে ঝিনাইদহ
মিডমার্টে ঝিনাইদহ-এর দোকান
ঝিনাইদহ থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
ঝিনাইদহ-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনঝিনাইদহ নিয়ে প্রশ্ন
ঝিনাইদহ-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
ঝিনাইদহ থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনখুলনা বিভাগের আরও জেলা
- বাগেরহাট সুন্দরবনের কোলে খান জাহানের মসজিদের শহর
- চুয়াডাঙ্গা খেজুরের গুড়, পান আর দর্শনা চিনিকলের সীমান্ত জেলা
- যশোর ফুলের রাজধানী, খেজুর গুড় আর বেনাপোল সীমান্তের জেলা
- খুলনা চিংড়ির নদীশহর, সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার
- কুষ্টিয়া লালন ও রবীন্দ্রনাথের ভূমি, তিলের খাজা আর কুমারখালীর তাঁত
- মাগুরা রাজা সীতারামের দেশ — পাটের খেত, পেড়া সন্দেশ আর খামারপাড়ার দই
- মেহেরপুর মুজিবনগর — যেখানে শপথ নিয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার
- নড়াইল এস এম সুলতানের চিত্রা নদীর দেশ, নৌকাবাইচ আর ক্রিকেটারদের জেলা
- সাতক্ষীরা আগাম আম, সফট-শেল কাঁকড়া আর পশ্চিম সুন্দরবন
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Jhenaidah District
- BBS Population and Housing Census 2022, Preliminary Report
- Wikipedia — Jhenaidah District (Census 2022 demographics)
- Wikipedia — Mosque city of Mohammadabad (Barobazar)
- নলডাঙ্গা মন্দির, কালীগঞ্জ — ছবি: Sagor Bosu · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- গলাকাটা মসজিদ, বারোবাজার — ছবি: Kazi Rashed Abdallah · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা