মেহেরপুর সম্পর্কে
বাংলাদেশের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে মেহেরপুর, দুই দিক থেকে ঘিরে আছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। উত্তর-পূর্বে কুষ্টিয়া, পূর্ব ও দক্ষিণে চুয়াডাঙ্গা। মাথাভাঙ্গা, ভৈরব, ইছামতী ও কাজলা নদী শুকনো সমতল ভূমির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে; দক্ষিণের বদ্বীপ অঞ্চলের তুলনায় এখানে গ্রীষ্মে গরম ও শীতে ঠান্ডা দুটোই বেশি।
মাত্র তিনটি উপজেলা — মেহেরপুর সদর, গাংনী ও মুজিবনগর — আর প্রায় সাত লাখ মানুষ নিয়ে এটি দেশের সবচেয়ে কম জনসংখ্যার জেলাগুলোর একটি। অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী; বিশেষ করে গাংনীর মাঠ শীতের সবজির জন্য পরিচিত, যা সারা দেশের বাজারে যায়।
তবে জাতির কাছে মেহেরপুর মানে একটি জায়গা: বৈদ্যনাথতলার আমবাগান, যার নাম পরে হয় মুজিবনগর, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেয়।
ইতিহাস
অঞ্চলটি দীর্ঘদিন নদীয়া জেলার অংশ ছিল, ব্রিটিশ আমলে শহরটি মহকুমা সদর হয়। নামের উৎপত্তি নিয়ে দুটি প্রচলিত কাহিনি আছে — একটিতে কিংবদন্তির খনার স্বামী মিহিরের সঙ্গে, অন্যটিতে মেহের আলী নামের এক সাধকের সঙ্গে সম্পর্ক টানা হয় — কোনোটিই নিশ্চিত নয়। উনিশ শতকে ব্রিটিশ নীলকররা এখানে নীল চাষ করাত, আমঝুপি ও ভাটপাড়ার কুঠি সেই সময়ের সাক্ষী। পলাশীর যুদ্ধের আগে আমঝুপিতে রবার্ট ক্লাইভ ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন বলে একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি আছে, তবে এর পক্ষে দৃঢ় প্রমাণ নেই।
১৯৪৭ সালের পর মেহেরপুর কুষ্টিয়া জেলার অংশ হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতারা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নেয়; জায়গাটির নাম রাখা হয় মুজিবনগর। পরে পাকিস্তানি সেনারা আমঝুপিসহ বিভিন্ন স্থানে গ্রামবাসীদের হত্যা করে। ১৯৮৪ সালে মেহেরপুর আলাদা জেলা হয়, আর ২০০০ সালে মুজিবনগরকে পৃথক উপজেলা করা হয়।
অর্থনীতি ও জীবিকা
প্রায় দশজনের সাতজনের জীবিকা কৃষি। কৃষকেরা ধান, গম, পাট, ভুট্টা, তামাক, ডাল এবং প্রচুর সবজি — ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো — চাষ করেন, যার বড় অংশ ট্রাকে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে যায়। মুজিবনগরের আশপাশের বাগান থেকে আসে আম, বিশেষ করে হিমসাগর; অনেক পরিবারে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন করা হয়। শিল্প বলতে ছোট মিল, কারখানা ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তাই ব্যবসা, পরিবহন আর অন্য শহরে কাজ আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
একই পরিবারের হাতে শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে তৈরি দুটি মিষ্টির জন্য মেহেরপুর বিখ্যাত: সাবিত্রী — চমচমের মতো ঘন মিষ্টি, যা ১৮৬১ সালে বড় বাজার এলাকায় প্রথম তৈরি হয়; আর গোল, রসালো রসকদম। জেলায় বেড়াতে এলে বেশির ভাগ মানুষ এক বাক্স নিয়ে ফেরেন।
১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসে স্মৃতিসৌধে জাতীয় অনুষ্ঠান হয়। কুষ্টিয়ার বাউল ও লোকগানের ধারা এখানেও আছে, আর বল্লভপুর ও ভবরপাড়ার পুরোনো ক্যাথলিক মিশনের কারণে বড়দিন স্থানীয় জীবনে বিশেষ জায়গা পেয়েছে।
মেহেরপুর-এর দর্শনীয় স্থান
-
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স
শপথস্থলের স্মৃতিসৌধটি ১৯৮৭ সালে সম্পন্ন হয়, পাশেই সেই আমবাগান। সংলগ্ন কমপ্লেক্সে যুদ্ধের সেক্টরগুলোর বিশাল মানচিত্র আর ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পূর্ণাকৃতির ভাস্কর্য রয়েছে।
-
আমঝুপি নীলকুঠি
মেহেরপুর শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার পূর্বে কাজলা নদীর তীরে ঔপনিবেশিক নীলকরের কুঠিবাড়ি, পুরোনো গাছ আর সবুজ চত্বরে ঘেরা। পিকনিক আর নীল যুগের এক ঝলক দেখার জন্য শান্ত জায়গা।
-
ভাটপাড়া নীলকুঠি
গাংনী উপজেলায় মেহেরপুর শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে আঠারো শতকের শেষ দিকে নির্মিত বলে কথিত ব্রিটিশ আমলের আরেকটি নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ।
-
বল্লভপুর মিশন
মুজিবনগরের কাছে বল্লভপুরে ক্যাথলিক মিশন ও গির্জা, অঞ্চলের প্রাচীনতম খ্রিষ্টান বসতিগুলোর একটি, ঐতিহাসিক গির্জাভবনসহ।
মেহেরপুর যে জন্য বিখ্যাত
মেহেরপুর কীভাবে যাবেন
ঢাকার গাবতলী থেকে সরাসরি বাসে প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টায় মেহেরপুর পৌঁছানো যায়। মেহেরপুরে রেলপথ নেই; নিকটতম স্টেশন চুয়াডাঙ্গা ও দর্শনা, সড়কপথে মোটামুটি এক ঘণ্টা, যেখানে ঢাকা–খুলনা আন্তঃনগর ট্রেন থামে। যশোর বিমানবন্দর সড়কপথে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। মেহেরপুর শহর থেকে মুজিবনগর প্রায় ১৫ কিলোমিটার, বাস বা অটোরিকশায় যাওয়া যায়।
হাট ও বাজার
- মেহেরপুর বড় বাজার
- মেহেরপুর শহরের পুরোনো বাজার; এখানেই সাবিত্রী ও রসকদম তৈরির মিষ্টির দোকান, পাশাপাশি শস্য, মসলা ও কাপড়ের ব্যবসায়ীরা।
- গাংনী বাজার
- গাংনী উপজেলার প্রধান বাজার, যেখানে আশপাশের গ্রামের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সবজি, গম, পাট ও গবাদিপশু কেনাবেচা করেন।
এক নজরে মেহেরপুর
মিডমার্টে মেহেরপুর-এর দোকান
মেহেরপুর থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
মেহেরপুর-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনমেহেরপুর নিয়ে প্রশ্ন
মেহেরপুর-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
মেহেরপুর থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনখুলনা বিভাগের আরও জেলা
- বাগেরহাট সুন্দরবনের কোলে খান জাহানের মসজিদের শহর
- চুয়াডাঙ্গা খেজুরের গুড়, পান আর দর্শনা চিনিকলের সীমান্ত জেলা
- যশোর ফুলের রাজধানী, খেজুর গুড় আর বেনাপোল সীমান্তের জেলা
- ঝিনাইদহ সুলতানি মসজিদ, নলডাঙ্গার মন্দির আর কালীগঞ্জের বিশাল বটগাছ
- খুলনা চিংড়ির নদীশহর, সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার
- কুষ্টিয়া লালন ও রবীন্দ্রনাথের ভূমি, তিলের খাজা আর কুমারখালীর তাঁত
- মাগুরা রাজা সীতারামের দেশ — পাটের খেত, পেড়া সন্দেশ আর খামারপাড়ার দই
- নড়াইল এস এম সুলতানের চিত্রা নদীর দেশ, নৌকাবাইচ আর ক্রিকেটারদের জেলা
- সাতক্ষীরা আগাম আম, সফট-শেল কাঁকড়া আর পশ্চিম সুন্দরবন
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Meherpur District
- BBS Population and Housing Census 2022, National Report (Vol. 1, final)
- Wikipedia — Meherpur District
- Wikipedia — Mujibnagar Memorial
- TBS News — Meherpur’s Sabitri and Ras Kadam sweets
- আমঝুপি নীলকুঠি, মেহেরপুর — ছবি: Ashikul Islam Anik · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স — ছবি: Hasib Sarker · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা