যশোর সম্পর্কে
যশোর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত; এর পশ্চিম সীমান্তে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। উত্তরে ঝিনাইদহ, পূর্বে মাগুরা ও নড়াইল, দক্ষিণে খুলনা ও সাতক্ষীরা। ভৈরব, কপোতাক্ষ, চিত্রা, বেতনা ও মুক্তেশ্বরী নদী ঘন চাষাবাদের সমতল ভূমির ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্বে ভবদহের নিচু অঞ্চল দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার জন্য পরিচিত।
যশোর শহর একটি ব্যস্ত আঞ্চলিক কেন্দ্র — এখানে বিমানবন্দর, বড় সেনানিবাস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন গণগ্রন্থাগার রয়েছে। শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে বেনাপোল দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর, ভারতের সঙ্গে স্থলপথের বাণিজ্যের বড় অংশ এখান দিয়েই চলে।
তবে বেশির ভাগ মানুষের কাছে যশোর মানে দুটি মৌসুমি জিনিস: গদখালীর আশপাশের গাঁদা, গ্লাডিওলাস আর গোলাপের মাঠ, যেখান থেকে সারা দেশে ফুল যায়; আর শীতের খেজুর রস ও গুড়, যাকে নিয়ে প্রবাদই আছে — খেজুরের রস, যশোরের যশ।
ইতিহাস
নামটি পুরোনো, উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ আছে। প্রচলিত একটি ব্যাখ্যায় একে ‘যশোহর’ অর্থাৎ যশ হরণকারী শব্দের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যা গৌড়ের পুরোনো রাজধানীর প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন জনপদকে বোঝাত বলে বলা হয়। ষোলো শতকের শেষে অঞ্চলটি বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম, মোগলবিরোধী রাজা প্রতাপাদিত্যের অধীন ছিল। ১৭৮১ সালে ব্রিটিশরা যশোরকে আলাদা জেলা করে, যাকে প্রায়ই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে বাংলায় গঠিত প্রথম জেলা বলা হয়। এরপর শহরটি প্রশাসন ও ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে বেড়ে ওঠে; ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি।
বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও সনেটের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালে কেশবপুরের সাগরদাঁড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মার্চের শেষে যশোর সেনানিবাসের বাঙালি সৈনিকেরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, আর শার্শার গোয়ালহাটিতে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ। ডিসেম্বরের শুরুতেই যশোর মুক্ত হয়, প্রথম মুক্ত জেলাগুলোর একটি হিসেবে।
অর্থনীতি ও জীবিকা
যশোরের কৃষি বৈচিত্র্যময় ও বাণিজ্যিক। ঝিকরগাছা ও শার্শায় শত শত হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হয়, আর গদখালীর পাইকারি বাজারের দামই সারা দেশের ফুল বিক্রেতাদের দাম ঠিক করে দেয়। সবজি, ধান, পাট, আখ ও খেজুর গুড় প্রধান ফসল। যশোর শহরের চাঁচড়া এলাকা দেশের সবচেয়ে পরিচিত মাছের হ্যাচারি কেন্দ্র, এখান থেকে সারা দেশের চাষিদের কাছে মাছের পোনা যায়। বাণিজ্য আরেক বড় খুঁটি: বেনাপোল স্থলবন্দর ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ সামলায়, আর অভয়নগরের নওয়াপাড়া নদীবন্দর দিয়ে সার, সিমেন্ট, কয়লা ও খাদ্যশস্য চলাচল করে; সেখানে পাটকলসহ নানা কারখানাও আছে। নকশিকাঁথা ও হাতে সেলাই করা ‘যশোর স্টিচ’-এর জন্যও যশোর সুপরিচিত।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
প্রতি জানুয়ারিতে কবির জন্মবার্ষিকী ঘিরে কপোতাক্ষের তীরে সাগরদাঁড়িতে বসে মধুমেলা — গান, কবিতা আর নানা পণ্যের দোকানে জমজমাট। শীতের সকালে তাজা খেজুর রস আর পাটালি গুড়ের পিঠা এখানকার ঘরোয়া রীতি, আর শার্শার জামতলার মিষ্টির দোকানগুলোর খ্যাতি জেলার বাইরেও ছড়িয়েছে।
নারীদের সূচিকর্ম এখানে জীবন্ত এক কারুশিল্প। গ্রামের ঘরে ঘরে তৈরি যশোর স্টিচের কুর্তা, শাড়ি আর নকশিকাঁথা স্থানীয় বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে সারা দেশে বিক্রি হয়।
যশোর-এর দর্শনীয় স্থান
-
মধুসূদনের বাড়ি, সাগরদাঁড়ি
কেশবপুরে কপোতাক্ষ নদের তীরে মাইকেল মধুসূদন দত্তের পৈতৃক বাড়ি, এখন বাগানসহ জাদুঘর। ছেলেবেলায় তিনি যে গাছের নিচে বসতেন বলে কথিত, সেটি এখনো কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।
-
গদখালীর ফুলের মাঠ
ঝিকরগাছা উপজেলায় যশোর–বেনাপোল সড়কের দুই পাশে গাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা আর গ্লাডিওলাসের মাঠ। শীতকাল, বিশেষ করে একুশে ফেব্রুয়ারি, পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসের আগের সপ্তাহগুলো ফুল দেখার সেরা সময়।
-
বেনাপোল স্থলবন্দর
ভারতের পেট্রাপোলের মুখোমুখি দেশের ব্যস্ততম স্থল সীমান্ত। কলকাতাগামী যাত্রীরা এখান দিয়েই পার হন, আর ট্রাকের দীর্ঘ সারি দেখে বন্দরের ব্যাপকতা বোঝা যায়।
-
ভরত ভায়না (দেউল ভরত), কেশবপুর
ভদ্রা নদীর পাশে ইটের বিশাল ঢিবি, যা আনুমানিক পঞ্চম থেকে সপ্তম শতকের একটি বৌদ্ধ মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ বলে ধারণা করা হয়। খননে কেন্দ্রীয় বেদির চারপাশে বহু কক্ষ পাওয়া গেছে।
-
যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি
১৮৫৪ সালে যশোর শহরের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত এই গ্রন্থাগার অঞ্চলের প্রাচীনতম গণগ্রন্থাগারগুলোর একটি; মিলনায়তন ও পাঠকক্ষসহ এটি এখনো শহরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
যশোর যে জন্য বিখ্যাত
যশোর কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সবচেয়ে সহজে পৌঁছানো যায় এমন জেলাগুলোর একটি যশোর। কয়েকটি বিমান সংস্থার ফ্লাইটে প্রায় ৪০ মিনিটে যশোর বিমানবন্দরে পৌঁছানো যায়। সায়েদাবাদ বা গাবতলী থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বাসে মোটামুটি চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাগে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগের ট্রেন, যেমন বেনাপোলগামী রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস, যশোর হয়ে চলে; যমুনা সেতু ও ঈশ্বরদী হয়ে পুরোনো আন্তঃনগর ট্রেনেও যশোর যাওয়া যায়।
হাট ও বাজার
- গদখালী ফুলের বাজার
- ঝিকরগাছার সড়কের পাশের পাইকারি বাজার, যা ভোরেই জমে ওঠে। চাষিরা ঝুড়িভর্তি গাঁদা আর গোলাপ-গ্লাডিওলাসের আঁটি নিয়ে আসেন, ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের ব্যাপারীরা তা কিনে নেন।
- যশোর বড় বাজার
- ভৈরব নদের পাশে যশোর শহরের পুরোনো কেন্দ্রীয় বাজার; মসলা, কাপড়, গুড়, বাসনপত্র ও মুদি পণ্যের দোকানে ঠাসা গলিপথ।
- বেনাপোল বাজার
- স্থলবন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যস্ত বাজার; ভারতগামী যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের জন্য মুদ্রা বিনিময়, কাপড় ও নিত্যপণ্যের দোকান এখানে।
এক নজরে যশোর
মিডমার্টে যশোর-এর দোকান
যশোর থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
যশোর-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনযশোর নিয়ে প্রশ্ন
যশোর-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
যশোর থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনখুলনা বিভাগের আরও জেলা
- বাগেরহাট সুন্দরবনের কোলে খান জাহানের মসজিদের শহর
- চুয়াডাঙ্গা খেজুরের গুড়, পান আর দর্শনা চিনিকলের সীমান্ত জেলা
- ঝিনাইদহ সুলতানি মসজিদ, নলডাঙ্গার মন্দির আর কালীগঞ্জের বিশাল বটগাছ
- খুলনা চিংড়ির নদীশহর, সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার
- কুষ্টিয়া লালন ও রবীন্দ্রনাথের ভূমি, তিলের খাজা আর কুমারখালীর তাঁত
- মাগুরা রাজা সীতারামের দেশ — পাটের খেত, পেড়া সন্দেশ আর খামারপাড়ার দই
- মেহেরপুর মুজিবনগর — যেখানে শপথ নিয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার
- নড়াইল এস এম সুলতানের চিত্রা নদীর দেশ, নৌকাবাইচ আর ক্রিকেটারদের জেলা
- সাতক্ষীরা আগাম আম, সফট-শেল কাঁকড়া আর পশ্চিম সুন্দরবন
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Jessore District
- BBS Population and Housing Census 2022, National Report (Vol. 1, final)
- BBS District Statistical Office, Jashore — Census 2022 district report (literacy)
- Wikipedia — Jessore District
- গদখালী ফুলের বাজার, ঝিকরগাছা — ছবি: Muhammad Amdad Hossain · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- মধুসূদনের বাড়ি, সাগরদাঁড়ি — ছবি: Munir Uddin Shamim · CC BY-SA 3.0 (উৎস, CC BY-SA 3.0)
English
বাংলা