দিনাজপুর সম্পর্কে
দিনাজপুরের আয়তন প্রায় ৩,৪৪৪ বর্গকিলোমিটার, আয়তনে রংপুর বিভাগের সবচেয়ে বড় জেলা। পুরো পশ্চিম সীমানা জুড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ; উত্তরে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়, পূর্বে নীলফামারী ও রংপুর, দক্ষিণে গাইবান্ধা ও জয়পুরহাট। ২০২২ সালের জনশুমারিতে ১৩টি উপজেলায় ৩৩ লাখের কিছু বেশি মানুষ গণনা করা হয়েছে, যাদের প্রায় পাঁচ ভাগের চার ভাগই গ্রামে থাকেন।
এখানকার জমি উঁচু, সমতল এবং দক্ষিণের নবীন পলিভূমির চেয়ে পুরোনো। লালচে মাটিতে পানি জমে না, তাই ধানের পাশাপাশি লিচু ও আমের বাগানও খুব ভালো হয়। জেলার ভেতর দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে গেছে পুনর্ভবা, আত্রাই, কান্তজিউ মন্দিরের পাশের ঢেপা আর তুলসীগঙ্গার মতো ছোট নদী। বড় নদী নেই বলে দিনাজপুরকে নদীর দেশ নয়, বরং বাগান আর ধানখেতের দেশ বলেই মনে হয়। বীরগঞ্জের সিংড়া আর নবাবগঞ্জে এখনো শালবনের কিছু অংশ টিকে আছে।
দেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছে দিনাজপুর মানে কাটারিভোগ চাল আর লিচু। আর ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এ জেলা মানে দেশের সেরা টেরাকোটা মন্দির এবং উত্তরবঙ্গের বড় জমিদারি দিনাজপুর রাজের রেখে যাওয়া প্রাসাদ, দিঘি ও মসজিদ।
ইতিহাস
লোকশ্রুতি অনুযায়ী দিনাজ বা দিনারাজ নামের এক সামন্ত রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠা করেন, আর রাজবাড়ির মৌজার নাম হয় তাঁর নামে। মোগল আমলে এ অঞ্চল শাসিত হতো ঘোড়াঘাট থেকে, যার পুরোনো দুর্গের ধ্বংসাবশেষ এখনো জেলার দক্ষিণে দেখা যায়। ১৭৮৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ঘোড়াঘাট সরকার বাতিল করে নতুন জেলা গঠন করে এবং রাজাদের আসনের নামে নাম রাখে দিনাজপুর। উনিশ শতকে এর সীমানা বহুবার বদলেছে, আর ১৯৮৪ সালে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় আলাদা জেলা হয়।
দিনাজপুর রাজের ছাপ আজও সবখানে। মহারাজা প্রাণনাথ আঠারো শতকের শুরুতে কান্তজিউ মন্দিরের কাজ শুরু করেন, আর তাঁর পুত্র রামনাথ ১৭৫২ সালের দিকে তা শেষ করেন। পলাশীর যুদ্ধের আগে রামনাথই রামসাগর দিঘি খনন করান। ১৯৪৬ সালে দিনাজপুর ছিল তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র, যেখানে বর্গাচাষিরা ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ দাবি করেছিলেন। সেই আন্দোলনের নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশের নামেই শহরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
অর্থনীতি ও জীবিকা
দিনাজপুর দেশের অন্যতম প্রধান শস্যভান্ডার। সাধারণ বোরো ও আমন ধানের পাশাপাশি এখানে কাটারিভোগ ও চিনিগুঁড়ার মতো সুগন্ধি জাতের চাষ হয়, যা সারা দেশে বেশি দামে বিক্রি হয়। পুলহাটসহ শহরের আশপাশে অসংখ্য স্বয়ংক্রিয় ও চাতালনির্ভর চালকল রয়েছে। ধানের পরে আসে গম, ভুট্টা, আলু ও সবজি। লিচুবাগান এখানে বড় মৌসুমি ব্যবসা, আর মাশিমপুরের বেদানা লিচু সবচেয়ে দামি। শিল্প মূলত কৃষিনির্ভর, যেমন বোচাগঞ্জের সেতাবগঞ্জ চিনিকল। ব্যতিক্রম পার্বতীপুর, যেখানে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি অবস্থিত। হাকিমপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চলে।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
এখানকার খাবারের কেন্দ্রে ভাত। অতিথি এলে দিনাজপুরের পরিবারে কাটারিভোগের পোলাও রান্না হয়, আর গ্রীষ্মের শুরুতে আত্মীয়দের কাছে ঝুড়িভর্তি লিচু উপহার পাঠানো এখানকার রেওয়াজ। স্থানীয় ভাষা উত্তরবঙ্গের রংপুরি উপভাষা পরিবারের অংশ। বীরগঞ্জ, নবাবগঞ্জ ও ফুলবাড়ীর সাঁওতাল ও ওরাওঁ সম্প্রদায় নিজেদের ভাষা, নাচ আর ফসলের উৎসব আজও ধরে রেখেছে।
বছরের সবচেয়ে বড় আয়োজন হেমন্তে রাস পূর্ণিমা ঘিরে কান্তজিউ মন্দিরের রাসমেলা। পুণ্যার্থী, ব্যবসায়ী আর পরিবার নিয়ে মানুষ আসেন কয়েক সপ্তাহের পূজা, দোকানপাট ও লোকজ পরিবেশনার টানে। শহরের দিনাজপুর জাদুঘরে রাজপরিবার ও জেলার প্রাচীন স্থানগুলোর ভাস্কর্য ও নিদর্শন সংরক্ষিত আছে।
দিনাজপুর-এর দর্শনীয় স্থান
-
কান্তজিউ মন্দির (কান্তনগর)
আঠারো শতকের মাঝামাঝি নির্মিত এই মন্দির শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে কাহারোল উপজেলায়। এর দেয়ালের প্রতিটি অংশ রামায়ণ, মহাভারত আর তখনকার দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যে আঁকা টেরাকোটা ফলকে ঢাকা। শুরুতে এর নয়টি চূড়া ছিল, যা ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে। তবু এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে অক্ষত টেরাকোটা মন্দির।
-
রামসাগর জাতীয় উদ্যান
শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে তাজপুরে ১৭৫০-এর দশকে হাতে খোঁড়া এক কিলোমিটারের বেশি লম্বা দিঘি। এটিকে দেশের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট দিঘি বলা হয়। ছায়াঘেরা পাড় এখন জাতীয় উদ্যান, যেখানে ছোট হরিণ বেষ্টনী, পিকনিকের জায়গা আর পুরোনো ঘাটের অবশেষ আছে।
-
নয়াবাদ মসজিদ
কান্তজিউ মন্দিরের অদূরে কাহারোলে ১৭৯৩ সালের তিন গম্বুজ ইটের মসজিদ। প্রচলিত আছে, মন্দির নির্মাণে আসা মুসলমান কারিগরদের জন্য এটি তৈরি হয়েছিল। এর টেরাকোটা অলংকরণ কাছ থেকে দেখার মতো।
-
দিনাজপুর রাজবাড়ি
শহরের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে দিনাজপুরের মহারাজাদের প্রাসাদ চত্বর। ফটক, মন্দির আর আঙিনাগুলো জীর্ণ হলেও এখনো আকর্ষণীয়, তাই কান্তনগর যাওয়ার আগে প্রথম গন্তব্য হিসেবে এটি ভালো।
দিনাজপুর যে জন্য বিখ্যাত
দিনাজপুর কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে দিনাজপুরের দূরত্ব ৪০০ কিলোমিটারের কিছু বেশি। গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে বাস যমুনা সেতু পার হয়ে মোটামুটি ৮–৯ ঘণ্টায় পৌঁছায়, ঈদের সময় আরও বেশি লাগে। কমলাপুর থেকে একতা এক্সপ্রেস ও দ্রুতযান এক্সপ্রেসের মতো আন্তনগর ট্রেন পার্বতীপুর জংশন হয়ে প্রায় ৯–১০ ঘণ্টায় দিনাজপুর যায়। সবচেয়ে দ্রুত উপায় হলো আকাশপথে প্রায় এক ঘণ্টায় নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে আরও ঘণ্টাখানেকে দিনাজপুর শহরে যাওয়া।
হাট ও বাজার
- বাহাদুর বাজার
- দিনাজপুর শহরের পুরোনো বাণিজ্যকেন্দ্র। পাইকারি চাল, মসলা ও মুদি দোকানে সরাসরি চালকল থেকে আসা কাটারিভোগ আর চিনিগুঁড়া মিলিয়ে দেখা যায়।
- গোর-এ-শহীদ ময়দানের লিচুর বাজার
- মে মাসের শেষ থেকে জুন পর্যন্ত শহরের কেন্দ্রের বড় মাঠটি লিচুর হাটে পরিণত হয়। জেলার নানা বাগান থেকে চাষিরা মাদ্রাজি, বোম্বাই, চায়না-৩ আর বেদানা লিচুর আঁটি নিয়ে আসেন।
- হিলি স্থলবন্দর
- হাকিমপুর উপজেলার সীমান্ত বাণিজ্যের শহর, ব্যস্ত দোকান আর গুদামে ভরা। ভারত থেকে চাল, পেঁয়াজসহ নানা পণ্য এখান দিয়ে আমদানি হয়।
এক নজরে দিনাজপুর
মিডমার্টে দিনাজপুর-এর দোকান
দিনাজপুর থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
দিনাজপুর-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনদিনাজপুর নিয়ে প্রশ্ন
দিনাজপুর-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
দিনাজপুর থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনরংপুর বিভাগের আরও জেলা
- গাইবান্ধা ব্রহ্মপুত্রের চরের দেশ, রসমঞ্জরী আর শীতের পোশাকের জেলা
- কুড়িগ্রাম ব্রহ্মপুত্র যেখানে বাংলাদেশে ঢোকে, নদী, চর আর ভাওয়াইয়ার দেশ
- লালমনিরহাট রেলের শহর, তিস্তা ব্যারাজ আর সীমান্তের তিনবিঘা করিডোর
- নীলফামারী নীলচাষের পুরোনো জনপদ, সৈয়দপুরের রেল কারখানা আর উত্তরের শিল্পাঞ্চল
- পঞ্চগড় দেশের উত্তর প্রান্ত, সমতলের চা-বাগান আর দিগন্তে কাঞ্চনজঙ্ঘা
- রংপুর উত্তরের রাজধানী, শতরঞ্জি, হাড়িভাঙ্গা আম আর বেগম রোকেয়ার জন্মভূমি
- ঠাকুরগাঁও দেশের গমের ভান্ডার, সূর্যপুরী আম আর প্রাচীন বিশাল আমগাছের জেলা
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Dinajpur District
- BBS Population and Housing Census 2022 — District Report: Dinajpur (final count; via Wikipedia)
- Wikipedia (Bangla) — দিনাজপুর জেলা
- কান্তজিউ মন্দির, কাহারোল — ছবি: Shuvajit BD · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- রামসাগর, দিনাজপুর — ছবি: Salim Khandoker · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা