ঢাকা সম্পর্কে
ঢাকা জেলা বাংলাদেশের ঠিক মাঝখানে। এর ভেতরে আছে দেশের রাজধানী, যা ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিচালনা করে, আর চারপাশে পাঁচটি উপজেলা: সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ ও দোহার। ২০২২ সালের জনশুমারিতে দেড় হাজার বর্গকিলোমিটারেরও কম এলাকায় প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ মানুষ গণনা করা হয়েছে, যা একে দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ জেলা বানিয়েছে। এখানকার প্রতি চারজনের প্রায় তিনজনই শহরে থাকেন।
এই জেলার চেহারা গড়েছে নদী। পুরান ঢাকার দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা, পশ্চিমে তুরাগ আর পূর্বে বালু নদী শহরকে ঘিরে রেখেছে, আর দক্ষিণ-পশ্চিমের গ্রামাঞ্চলে ধলেশ্বরী, ইছামতী ও কালীগঙ্গা ছড়িয়ে আছে; দোহারের কাছে পদ্মা জেলার সীমা টেনেছে। বেলাই বিলসহ নবাবগঞ্জের নিচু জলাভূমি বর্ষায় ডুবে যায়, তাই শহর বেড়েছে উত্তরে, সাভার ও উত্তরার দিকে মধুপুর গড়ের উঁচু লাল মাটিতে।
বেড়াতে আসা মানুষের কাছে ঢাকা আসলে দুটি আলাদা জায়গা। পুরান ঢাকা সরু গলি, মোগল ও ঔপনিবেশিক স্থাপনা, রিকশা আর এমন সব বিশেষায়িত বাজারের জগৎ, যেখানে শত শত বছর ধরে একই পণ্যের কেনাবেচা চলছে। উত্তরের নতুন ঢাকা অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, পোশাক কারখানার সদর দপ্তর আর শপিং সেন্টারের শহর। শহরের সীমানা পেরোলেই সাভার ও ধামরাইয়ে এখনো ইটভাটা, ধানখেত, মন্দির আর কারিগরদের গ্রাম চোখে পড়ে।
ইতিহাস
এখানকার জনবসতি রাজধানীর চেয়ে অনেক পুরোনো। আদি মধ্যযুগে সাভার ছিল একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র, আর ঢাকা নামটি সেন আমলের বলে কথিত ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত বলে অনেকে মনে করেন। ১৬০৮ সালে মোগলরা বাংলার রাজধানী এখানে আনলে শহরটি সত্যিকারের রাজধানী হয়ে ওঠে; সুবাদার ইসলাম খান এর নাম রাখেন জাহাঙ্গীরনগর। শায়েস্তা খানের মতো শাসকদের আমলে ঢাকার মসলিন এশিয়া ও ইউরোপজুড়ে খ্যাতি পায়, আর লালবাগ কেল্লা, বড় কাটরা ও অনেক মসজিদ এই সময়েরই নির্মাণ।
ব্রিটিশ প্রশাসনিক ঢাকা জেলা গঠিত হয় ১৭৭২ সালে। মুর্শিদাবাদ ও পরে কলকাতার উত্থানে শহরটির গুরুত্ব কমে যায়, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর অল্প সময়ের জন্য পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হয়, আর ১৯৪৭ সালে হয় পূর্ববঙ্গের রাজধানী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ভাষণ এবং ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ, সবই ঘটেছে এখানে। তখন থেকেই ঢাকা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী।
অর্থনীতি ও জীবিকা
ঢাকা দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতির কেন্দ্র। ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর ও পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রধান কার্যালয় মতিঝিল, গুলশান, বনানী ও তেজগাঁওয়ে, আর সাভারের ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশের পোশাক কারখানাগুলোতে লাখো শ্রমিক কাজ করেন, যাঁদের বেশির ভাগই নারী। পুরান ঢাকা এখনো সারা দেশের পাইকারি বাজারের প্রাণ: কাপড়ের জন্য ইসলামপুর, প্রসাধনী, খেলনা ও প্যাকেজিংয়ের জন্য চকবাজার, মুদিপণ্যের জন্য বাবুবাজার আর মসলার জন্য মৌলভীবাজার। শহরের বাইরে সাভার ও ধামরাইয়ে দুগ্ধখামার, ইটভাটা আর সবজি চাষ হয়, কেরানীগঞ্জে দেশীয় বাজারের জন্য তৈরি পোশাকের বিশাল কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, আর ধামরাইয়ের কারিগরেরা এখনো হারানো মোম পদ্ধতিতে পিতল ও কাঁসার জিনিস ঢালাই করেন।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
পুরান ঢাকার আছে নিজস্ব ভাষা, আদি ঢাকাইয়াদের ঢাকাইয়া বুলি, আর নিজস্ব খাবার: কাচ্চি বিরিয়ানি, মোরগ পোলাও, মাটির তন্দুরে সেঁকা বাকরখানি এবং রমজানে চকবাজারের বিখ্যাত ইফতার বাজার। পৌষের শেষ দিনে সাকরাইন উৎসবে প্রতি জানুয়ারিতে পুরান ঢাকার ছাদ ঘুড়িতে ভরে যায়, আর পহেলা বৈশাখ শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে।
ধর্মীয় জীবনও বৈচিত্র্যময়। ঢাকাকে বলা হয় মসজিদের শহর, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, আরমানিটোলা ও তেজগাঁওয়ে টিকে আছে আর্মেনীয় ও ক্যাথলিক গির্জা, আর ধামরাইয়ের রথযাত্রা, তার বিশাল কাঠের রথসহ, দেশের অন্যতম প্রাচীন রথ উৎসব। শাঁখারীবাজারে আজও শঙ্খ কেটে শাঁখা বানানো ও বিক্রি হয়।
ঢাকা-এর দর্শনীয় স্থান
-
লালবাগ কেল্লা
১৬৭৮ সালে শাহজাদা মুহাম্মদ আজম এই দুর্গের কাজ শুরু করেন, পরে শায়েস্তা খান তা এগিয়ে নেন, তবে শেষ হয়নি। পুরান ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রাচীরঘেরা বাগানের ভেতরে আছে পরী বিবির সমাধি, তিন গম্বুজের মসজিদ এবং সুবাদারের দরবার হল ও হাম্মামখানা। ভিড় এড়াতে সকালে যাওয়াই ভালো।
-
আহসান মঞ্জিল
বুড়িগঙ্গার তীরে কুমারটুলীতে ঢাকার নবাবদের গোলাপি প্রাসাদ, ১৮৭০-এর দশকে নির্মাণ শেষ হয়, এখন জাদুঘর। সংস্কার করা কক্ষগুলোতে নবাব পরিবারের আসবাব, প্রতিকৃতি, জলসাঘর ও দরবার হল দেখা যায়।
-
তারা মসজিদ
আরমানিটোলার ছোট্ট এই মসজিদের দেয়াল আর গম্বুজ চীনা ও জাপানি চীনামাটির টুকরো দিয়ে মোজাইক করা, যার প্রধান নকশা নীল তারা। আহসান মঞ্জিল থেকে হেঁটেই যাওয়া যায়।
-
জাতীয় সংসদ ভবন
শেরেবাংলা নগরে স্থপতি লুই কানের নকশা করা কংক্রিট ও মার্বেলের বিশাল জাতীয় সংসদ ভবন, চারপাশে কৃত্রিম লেক আর সবুজ চত্বর। বাইরে থেকে দেখলেও আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম সেরা নিদর্শন বলে মনে হয়।
-
জাতীয় স্মৃতিসৌধ, সাভার
শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সাভারে সাত স্তম্ভের জাতীয় স্মৃতিসৌধ মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে নির্মিত। ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরে এর সাজানো চত্বর ও গণকবরে মানুষের ঢল নামে।
-
ঢাকেশ্বরী মন্দির
বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির হিসেবে পরিচিত, শহরের নামের সঙ্গেও যুক্ত। লালবাগের কাছের এই মন্দির চত্বর দুর্গাপূজার সময় রাজধানীর উৎসবের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
ঢাকা যে জন্য বিখ্যাত
ঢাকা কীভাবে যাবেন
বাংলাদেশের বেশির ভাগ যাত্রা শুরু বা শেষ হয় ঢাকায়। কুর্মিটোলার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশি-বিদেশি ফ্লাইট ওঠানামা করে। ট্রেন থামে কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশনে, আর পদ্মা সেতুর রেলপথ এখন শহরকে দক্ষিণ-পশ্চিমের সঙ্গে যুক্ত করেছে। দূরপাল্লার বাস উত্তর ও পশ্চিমের জন্য গাবতলী, দক্ষিণ ও পূর্বের জন্য সায়েদাবাদ আর উত্তর-পূর্বের জন্য মহাখালী টার্মিনাল ব্যবহার করে, আর বরিশাল ও উপকূলের লঞ্চ ছাড়ে বুড়িগঙ্গার সদরঘাট থেকে। শহরের ভেতরে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬ মেট্রোরেলই সবচেয়ে দ্রুত; সড়কপথে চললে যানজটের জন্য হাতে বাড়তি সময় রাখুন।
হাট ও বাজার
- ইসলামপুর ও চকবাজার
- পুরান ঢাকার পাইকারি বাজারের কেন্দ্র: ইসলামপুরে থান ধরে শাড়ি, থ্রি-পিস ও শার্টের কাপড়, আর চকবাজারে প্রসাধনী, খেলনা, প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং সামগ্রী। দেশের নানা প্রান্তের বিক্রেতারা এখান থেকেই মাল তোলেন।
- কারওয়ান বাজার
- রাজধানীর প্রধান কাঁচাবাজার ও পাইকারি আড়ত। ভোরের আগে সবচেয়ে ব্যস্ত, যখন দেশের সব প্রান্ত থেকে ট্রাকে সবজি, ফল, মাছ ও ডিম নামে।
- ঢাকা নিউমার্কেট ও গাউছিয়া
- নীলক্ষেতের কাছে ১৯৫০-এর দশকের এই বাজার ও আশপাশের মার্কেট পোশাক, কাপড়, জুতা আর রান্নাঘরের জিনিসের জন্য বিখ্যাত; রাস্তার ওপারেই নীলক্ষেতের বইয়ের দোকান। দরদাম করাই এখানকার নিয়ম।
- মিরপুর বেনারসি পল্লী
- মিরপুরের এই এলাকায় তাঁতি আর দোকানিরা সরাসরি তাঁত ও শোরুম থেকে বেনারসি, কাতান ও জামদানি শাড়ি বিক্রি করেন। ঈদ আর বিয়ের মৌসুমে ভিড় সবচেয়ে বেশি।
এক নজরে ঢাকা
মিডমার্টে ঢাকা-এর দোকান
ঢাকা-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনঢাকা নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকা-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
ঢাকা থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনঢাকা বিভাগের আরও জেলা
- ফরিদপুর পদ্মাপাড়ের সোনালি আঁশের দেশ, পল্লীকবির জন্মভূমি
- গাজীপুর ঢাকার উত্তরে শালবন, কাঁঠালবাগান আর কারখানার জেলা
- গোপালগঞ্জ মধুমতী তীরের বিলের দেশ: ভাসমান বাগান আর টুঙ্গিপাড়া
- কিশোরগঞ্জ হাওরের প্রবেশদ্বার, শোলাকিয়া আর কবি চন্দ্রাবতীর জেলা
- মাদারীপুর আড়িয়াল খাঁ তীরের শহর: খেজুরের গুড়, শাহ মাদার আর শকুনি লেক
- মানিকগঞ্জ যেখানে যমুনা মেশে পদ্মায়: জমিদারবাড়ি আর হাজারী গুড়
- মুন্সিগঞ্জ প্রাচীন বিক্রমপুর: আলু, পাতক্ষীর আর পদ্মা সেতুর উত্তর প্রান্ত
- নারায়ণগঞ্জ প্রাচীন সোনারগাঁও, জামদানির তাঁত আর শীতলক্ষ্যার নিটওয়্যার বন্দর
- নরসিংদী মাধবদীর তাঁত, লটকনের বাগান আর প্রাচীন উয়ারী-বটেশ্বর
- রাজবাড়ী গোয়ালন্দ আর দৌলতদিয়া: পেঁয়াজ-পাটের দেশে পদ্মার প্রবেশদ্বার
- শরীয়তপুর পদ্মা-মেঘনার মিলনে জাজিরা, কীর্তিনাশা আর বিবিখানা পিঠা
- টাঙ্গাইল টাঙ্গাইল শাড়ি, পোড়াবাড়ির চমচম আর মধুপুরের শালবন
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Dhaka District
- BBS Population and Housing Census 2022, National Report Vol. 1 (final enumerated figures, Nov 2023)
- Wikipedia — Dhaka District
- আহসান মঞ্জিল, পুরান ঢাকা — ছবি: Shafiul Islam Shaikot · CC BY 4.0 (উৎস, CC BY 4.0)
- ওপর থেকে লালবাগ কেল্লা — ছবি: Pinu Rahman · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা