ফরিদপুর সম্পর্কে
ফরিদপুর পদ্মার দক্ষিণ-পশ্চিম তীরে, ঢাকা থেকে ১০০ কিলোমিটারের কিছু বেশি দূরে। পুরোনো বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের নাম এই জেলা থেকেই, যার মধ্যে আজকের রাজবাড়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জও ছিল। জেলায় ৯টি উপজেলা: ফরিদপুর সদর, আলফাডাঙ্গা, ভাঙ্গা, বোয়ালমারী, চরভদ্রাসন, মধুখালী, নগরকান্দা, সদরপুর ও সালথা। ২০২২ সালের জনশুমারিতে এখানে প্রায় ২১ লাখ ৬৩ হাজার মানুষ গণনা করা হয়েছে, যাঁদের বেশির ভাগই গ্রামে থাকেন।
জমি সমতল, পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ আর কুমার নদের পলিতে গড়া নবীন বদ্বীপ; পশ্চিম সীমা ধরে বয়ে গেছে মধুমতী। প্রতি বর্ষায় নদীর পানি নিচু মাঠে ছড়িয়ে পড়ে, নেমে যাওয়ার পর রেখে যায় পলি, আর সেই পলির জোরেই ফরিদপুর দেশের অন্যতম প্রধান পাট ও পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা। চরভদ্রাসন ও সদরপুরের চরগুলো পদ্মার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বছর বদলে যায়।
২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ফরিদপুর রাজধানীর অনেক কাছে চলে এসেছে। জেলার দক্ষিণের ভাঙ্গা এখন ঢাকার এক্সপ্রেসওয়ে আর নতুন রেলপথের বড় সংযোগস্থল, আর কুমার নদের তীরের পুরোনো জেলা শহরটি ঢাকা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাঝের সুবিধাজনক যাত্রাবিরতির জায়গা হয়ে উঠেছে।
ইতিহাস
ফরিদপুর নামের আগে শহরটির নাম ছিল ফতেহাবাদ। পনেরো শতকের শুরু থেকে এটি বাংলার সুলতানদের টাকশাল শহর ছিল, মোগল নথিতে হাভেলি মহাল ফতেহাবাদ আর পর্তুগিজ মানচিত্রে ফাতিয়াবাস নামে এর উল্লেখ আছে। পরে চিশতিয়া তরিকার সুফি সাধক শাহ ফরিদউদ্দিন মাসুদের নামে এর নাম হয় ফরিদপুর। ১৭৮৬ সালে ব্রিটিশরা ঢাকা থেকে আলাদা করে একটি জেলা গঠন করে, প্রথমে যার নাম ছিল ঢাকা জালালপুর; উনিশ শতকের শুরুতে ফরিদপুর নাম ও সদর দপ্তর আসে। এই সময়েই হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তাঁর ছেলে দুদু মিয়া এ অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে ফরায়েজি আন্দোলন গড়ে তোলেন।
ফরিদপুর অনেক লেখক ও নেতার জন্ম দিয়েছে। নকশী কাঁথার মাঠের কবি জসীমউদ্দীন শহরের কাছে অম্বিকাপুরে বড় হয়েছেন; মধ্যযুগের কবি আলাওল, চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন আর কথাসাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্রের জন্মও এই জেলায়, আর শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়াও ছিল বৃহত্তর ফরিদপুরের অংশ। ১৯৮৪ সালে পুরোনো মহকুমাগুলো পাঁচটি জেলায় ভাগ হলে আজকের ফরিদপুর জেলা গঠিত হয়।
অর্থনীতি ও জীবিকা
জেলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। তোষা পাট উৎপাদনে ফরিদপুর নিয়মিত দেশের শীর্ষ জেলাগুলোর একটি; গ্রীষ্মের শেষে রাস্তার ধারে পাট পচানো আর সোনালি আঁশ শুকানোর দৃশ্য চোখে পড়ে। পেঁয়াজ উৎপাদনেও এটি অন্যতম বড় জেলা, বিশেষ করে সালথা, নগরকান্দা ও বোয়ালমারী; পাশাপাশি পেঁয়াজের বীজ, মসুর ডাল, আখ আর শীতে গুড়ের জন্য খেজুরগাছের রস সংগ্রহ হয়। পাটকল, চিনিকল আর চালকলই স্থানীয় শিল্পের বড় অংশ, আর পদ্মা ও তার শাখানদীতে মাছ ধরা ও নৌকা তৈরির কাজ চলে।
খাবার, সংস্কৃতি ও উৎসব
ফরিদপুরের নাম পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, যাঁর কাব্যে গ্রামের জীবন আর নকশিকাঁথা সাহিত্য হয়ে উঠেছে। প্রতি জানুয়ারিতে কবির বাড়ির কাছে জসীম মেলা বসে, যেখানে লোকশিল্পী, হস্তশিল্পের দোকান আর আশপাশের জেলার মানুষের ভিড় জমে। জেলায় বাউল, মুর্শিদি, জারি ও কবিগানের জোরালো ঐতিহ্য আছে, বর্ষার পরে নদীতে নৌকাবাইচ হয়, আর হিন্দু সম্প্রদায়ের রথযাত্রা ও দুর্গাপূজা ধুমধামে পালিত হয়।
এখানকার খাবার নদী আর ঋতুর সঙ্গে বদলায়: বর্ষায় পদ্মার ইলিশ, শীতে খেজুরের গুড় আর পিঠা, আর রোজকার রান্নায় প্রচুর ডাল ও তাজা পেঁয়াজ।
ফরিদপুর-এর দর্শনীয় স্থান
-
মথুরাপুর দেউল
মধুখালী উপজেলায় বারো কোণের উঁচু ইটের মন্দির-মিনার, সাধারণত সতেরো শতকের বলে ধরা হয়। এর দেয়ালজুড়ে সারি সারি সূক্ষ্ম টেরাকোটার কাজ, আর খোলা গ্রামীণ মাঠে এটি একা দাঁড়িয়ে আছে।
-
পাথরাইল মসজিদ
ভাঙ্গা উপজেলার পাথরাইলে সুলতানি আমলের ইটের মসজিদ, সাধারণত ষোলো শতকের শুরুর দিকের বলে ধরা হয়। এর লম্বা সম্মুখভাগ খোদাই করা টেরাকোটায় সাজানো, আর এটি জেলার টিকে থাকা প্রাচীনতম ভবনগুলোর একটি।
-
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বাড়ি
ফরিদপুর শহরের প্রান্তে কুমার নদের পাশে অম্বিকাপুরে কবির পৈতৃক বাড়ি, এখন ছোট জাদুঘরসহ স্মৃতিকেন্দ্র। কাছেই ডালিম গাছের তলায় কবির কবর, যে গাছের কথা তিনি কবিতায় লিখেছিলেন।
-
সাতৈর মসজিদ
বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈরে বহু গম্বুজের মধ্যযুগীয় মসজিদ, হোসেন শাহি আমলের সঙ্গে যুক্ত। সাতৈর গ্রাম ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা জায়নামাজের জন্যও পরিচিত।
-
কানাইপুর জমিদারবাড়ি
শহর থেকে অল্প দূরে কানাইপুরে এক জমিদার পরিবারের জীর্ণ প্রাসাদ, এর স্তম্ভ আর পুকুরঘাট এ অঞ্চলের জমিদারি আমলের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ফরিদপুর যে জন্য বিখ্যাত
ফরিদপুর কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়ি পদ্মা সেতু পার হয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে ধরে যাত্রাবাড়ীর যানজট ভেদে মোটামুটি আড়াই থেকে তিন ঘণ্টায় ফরিদপুর শহরে পৌঁছায়। বাস ছাড়ে সায়েদাবাদ ও গাবতলী থেকে। পদ্মা সেতুর রেলপথে ট্রেন ভাঙ্গা পর্যন্ত যায়, আর রাজবাড়ী থেকে আসা রেললাইনে ফরিদপুর শহরেও স্টেশন আছে। জেলার উত্তরাংশে যেতে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিপথ এখনো ব্যবহার হয়।
হাট ও বাজার
- কানাইপুর হাট
- ফরিদপুর সদরে জেলার অন্যতম বড় পাটের হাট। পাটের মৌসুমে হাটবারে কৃষকেরা গাড়ি বোঝাই করে আঁশ নিয়ে আসেন, আর ব্যাপারীরা তা কিনে দেশের নানা পাটকলে পাঠান।
- তালমা হাট
- নগরকান্দা উপজেলার বড় হাট, পাট আর বসন্তে সদ্য তোলা পেঁয়াজের স্তূপের জন্য পরিচিত।
- মালিগ্রাম বাজার
- ভাঙ্গা উপজেলার বড় পাটের বাজার, এক্সপ্রেসওয়ে থেকে এখন সহজেই যাওয়া যায়।
এক নজরে ফরিদপুর
মিডমার্টে ফরিদপুর-এর দোকান
ফরিদপুর থেকে এখনো কোনো দোকান মিডমার্টে বিক্রি করছে না।
ফরিদপুর-এর দোকান থেকে কেনাকাটা
মিডমার্টের প্রতিটি দোকান নিজের মতো করে টাকা নেয় এবং নিজেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করে — মিডমার্ট কখনো আপনার টাকা বা পার্সেল হাতে নেয় না। ডেলিভারি চার্জ দোকানপ্রতি: তিনটি দোকান থেকে অর্ডার করলে তিনটি ডেলিভারি চার্জ দিতে হবে।
ডেলিভারি চার্জের আনুমানিক হিসাব দেখুনফরিদপুর নিয়ে প্রশ্ন
ফরিদপুর-এ কিছু বানান বা ফলান?
বিনামূল্যে দোকান খুলুন আর সারা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে বিক্রি করুন। কোনো কমিশন বা লিস্টিং ফি নেই — ক্রেতা সরাসরি আপনাকে টাকা দেন, কুরিয়ার বেছে নেন আপনি।
ফরিদপুর থেকে অনলাইনে বিক্রি করুনঢাকা বিভাগের আরও জেলা
- ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরের রাজধানী: মোগল দুর্গ, মসলিনের স্মৃতি আর কখনো না থামা এক শহর
- গাজীপুর ঢাকার উত্তরে শালবন, কাঁঠালবাগান আর কারখানার জেলা
- গোপালগঞ্জ মধুমতী তীরের বিলের দেশ: ভাসমান বাগান আর টুঙ্গিপাড়া
- কিশোরগঞ্জ হাওরের প্রবেশদ্বার, শোলাকিয়া আর কবি চন্দ্রাবতীর জেলা
- মাদারীপুর আড়িয়াল খাঁ তীরের শহর: খেজুরের গুড়, শাহ মাদার আর শকুনি লেক
- মানিকগঞ্জ যেখানে যমুনা মেশে পদ্মায়: জমিদারবাড়ি আর হাজারী গুড়
- মুন্সিগঞ্জ প্রাচীন বিক্রমপুর: আলু, পাতক্ষীর আর পদ্মা সেতুর উত্তর প্রান্ত
- নারায়ণগঞ্জ প্রাচীন সোনারগাঁও, জামদানির তাঁত আর শীতলক্ষ্যার নিটওয়্যার বন্দর
- নরসিংদী মাধবদীর তাঁত, লটকনের বাগান আর প্রাচীন উয়ারী-বটেশ্বর
- রাজবাড়ী গোয়ালন্দ আর দৌলতদিয়া: পেঁয়াজ-পাটের দেশে পদ্মার প্রবেশদ্বার
- শরীয়তপুর পদ্মা-মেঘনার মিলনে জাজিরা, কীর্তিনাশা আর বিবিখানা পিঠা
- টাঙ্গাইল টাঙ্গাইল শাড়ি, পোড়াবাড়ির চমচম আর মধুপুরের শালবন
তথ্যসূত্র ও ছবির কৃতজ্ঞতা
সংখ্যাগুলো নিচের তথ্যসূত্র থেকে নেওয়া। আলাদা করে বলা না থাকলে জনসংখ্যার তথ্য ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা থেকে।
- Banglapedia — Faridpur District
- BBS Population and Housing Census 2022, National Report Vol. 1 (final enumerated figures, Nov 2023)
- Wikipedia — Faridpur District
- Faridpur district portal
- মথুরাপুর দেউল, মধুখালী — ছবি: Rakibul Islam Biswas · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
- পাথরাইল মসজিদ, ভাঙ্গা — ছবি: Kazi Rashed Abdallah · CC BY-SA 4.0 (উৎস, CC BY-SA 4.0)
English
বাংলা